জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও ভোগান্তির মুখে পড়ছেন সাংবাদিকরা। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে দীর্ঘসূত্রতা, কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি, তথ্য দিতে অনীহা, ফোনে সাড়া না দেওয়া এবং এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে। এতে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ও জনস্বার্থের সংবাদ যথাসময়ে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সাংবাদিকদের দায়িত্বের অন্যতম অংশ হলো সাধারণ মানুষের সমস্যা, অনিয়ম, দুর্নীতি, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সরকারি সেবার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। তবে তথ্য সংগ্রহের পর্যায়েই নানা জটিলতার মুখোমুখি হলে অনুসন্ধানী ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
স্থানীয় পর্যায়ে, বিশেষ করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাংবাদিকদের। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার জন্য অনেক সময় বারবার অফিসে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া তথ্য দেওয়া যাবে না’ বলে জানানো হয়। ফলে সাধারণ একটি তথ্য সংগ্রহ করতেও কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায় বলে অভিযোগ সাংবাদিকদের।
সাংবাদিকদের আরও অভিযোগ, কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব দেখান। কোনো ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সরাসরি তথ্য না দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়। আবার কেউ কেউ সাংবাদিকের পরিচয়পত্র বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুললেও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ে সহযোগিতা করেন না।
তথ্য না পাওয়ার প্রভাব
তথ্য সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতার প্রভাব শুধু সাংবাদিকদের ওপরই পড়ে না; এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে। কোনো অভিযোগ বা অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া না গেলে সংবাদটি সম্পূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাংবাদিকতার প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বক্তব্য দিতে অনীহা প্রকাশ করলে বা সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে গেলে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তথ্য অধিকার ও সাংবাদিকতার দায়িত্ব
বাংলাদেশে তথ্য পাওয়ার অধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃত। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ এবং যাচাইযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। তথ্যের উৎস যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তথ্যের নথিপত্র সংরক্ষণ সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাংবাদিকদের মতে, তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত সাংবাদিকদের সঙ্গে পেশাগত ও স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখা এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় সরবরাহ করা।
সমাধান কীভাবে
সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের ভোগান্তি কমাতে সরকারি দপ্তরগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার নাম ও যোগাযোগের তথ্য দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি তথ্য অনলাইনে প্রকাশ ও নিয়মিত হালনাগাদ করা হলে সাংবাদিকসহ সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হতে পারে।
অন্যদিকে সাংবাদিকদেরও পরিচয়পত্র ব্যবহার, তথ্যের উৎস যাচাই, প্রয়োজন হলে লিখিতভাবে তথ্য চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইনের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাংবাদিক ও প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, পেশাগত সম্মান এবং তথ্যের স্বচ্ছ প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে তথ্য সংগ্রহের জটিলতা কমানো সম্ভব। এতে সাংবাদিকরা যেমন দ্রুত ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের সুযোগ পাবেন, তেমনি সাধারণ মানুষও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সঠিক তথ্য জানতে পারবেন।
জনস্বার্থের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকের মূল দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরা। এ দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন তথ্যের স্বচ্ছ, সময়োপযোগী ও নিয়মতান্ত্রিক প্রবাহ।
