বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রক্রিয়া ‘এল নিনো’ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। মার্কিন আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, চলতি বছরের শেষভাগে এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী রূপ ধারণ করতে পারে। এর প্রভাবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তীব্র দাবদাহ, খরা ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যারোনটিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) জানায়, বিষুবরেখার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উষ্ণ হয়ে উঠেছে, যা এল নিনো গঠনের স্পষ্ট লক্ষণ। সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে এল নিনোর সূচনা ঘোষণা করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, খরা, তাপপ্রবাহ এবং ঝড়ের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবারের ঘটনাটির। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এটিকে “জরুরি জলবায়ু সতর্কতা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নোয়ার তথ্য অনুযায়ী, আগামী শরৎ ও শীতের শুরুতে এল নিনো এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে, ১৯৫০ সালের পর থেকে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে বড় এল নিনোগুলোর তালিকায় স্থান পেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতির সম্ভাবনা প্রায় ৬৩ শতাংশ। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা ও জেট স্ট্রিমে পরিবর্তন আসতে পারে, যা খরা, তীব্র ঝড় এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগে অতিরিক্ত তাপ সঞ্চয়ের ফলে বছরের শেষ দিকে বৈশ্বিক আবহাওয়া আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। শরৎ ও শীতের শুরুতে অনেক অঞ্চলে আর্দ্রতা বৃদ্ধি, ঝড়ো হাওয়া এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হবে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে, ক্যালিফোর্নিয়ায় দেখা দিতে পারে আর্দ্র শীতকাল। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি, বন্যা এবং অতিরিক্ত উষ্ণ আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়লেও উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় একই সঙ্গে খরা ও অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এল নিনোর প্রভাবে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ব্রাজিলে ভুট্টা ও ধানের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাধারণত এল নিনো গ্রীষ্মে শুরু হয়ে শীতকালে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছে এবং পরবর্তী বসন্তে দুর্বল হয়ে যায়। তবে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী মুহাম্মদ আজহার এহসানের মতে, সাম্প্রতিক লক্ষণগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এবারের এল নিনো স্বাভাবিক সময়ের এক থেকে দুই মাস আগেই সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছাতে পারে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েল ভেচি বলেন, বড় আকারের এল নিনো সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর প্রভাব কয়েক বছর পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারজনিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান এল নিনোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়তে পারে।
ইতোমধ্যে আবহাওয়াবিদদের একাংশ এই এল নিনোকে ‘সুপার এল নিনো’ বা ‘গডজিলা’ নামে অভিহিত করতে শুরু করেছেন। তবে বিজ্ঞানীরা আতঙ্কিত না হয়ে সম্ভাব্য চরম আবহাওয়া মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।