উপকূলসংলগ্ন পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য। দস্যুদের ভয়, চাঁদাবাজি ও অপহরণের আতঙ্কে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে যেতে পারছেন না স্থানীয় জেলে ও বনজীবীরা। ফলে জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে উপকূলের হাজারো পরিবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালপথে কয়েকটি দস্যু চক্র সক্রিয় রয়েছে। জেলেরা বনে প্রবেশ করলেই তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, জাল কেটে দেওয়া এমনকি অপহরণের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানান, আগে বন বিভাগের অনুমতি (পাস) নিয়ে তারা নিয়মিত সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতেন। কিন্তু বর্তমানে দস্যুদের ভয়ে অনেকেই বনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে চাঁদা দিয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন।
এক জেলে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, বনই আমাদের একমাত্র রুটি-রুজি। কিন্তু এখন বনে গেলেই দস্যুরা ঘিরে ধরে টাকা দাবি করে। একেকটি নৌকা থেকে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। টাকা না দিলে মারধর করে, জাল কেটে দেয়।”
আরেক বনজীবী জানান, “দস্যুদের কারণে সুন্দরবনে এখন কোনো নিরাপত্তা নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বনে যেতে হয়। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাও যেতে বাধা দেয়। কিন্তু বনে না গেলে খাবো কী?”
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের গৃহিণী মর্জিনা খাতুন বলেন, “ডাকাতের ভয়ে আমার স্বামী বনে কাঁকড়া ধরতে যেতে পারছে না। সামনে ঈদ, এখনো বাচ্চাদের নতুন কাপড় কিনে দিতে পারিনি। এভাবে চলতে থাকলে এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল জানায়, কয়েক বছর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে অনেক বনদস্যু আত্মসমর্পণ করেছিল। এতে সুন্দরবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। তবে সম্প্রতি আবারও নতুন করে দস্যু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠছে।
বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক জানান, সুন্দরবনে নিরাপত্তা জোরদারে বনরক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে। দস্যুদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে দস্যু আতঙ্কে বনজীবীদের বনে যাওয়া কমে যাওয়ায় স্থানীয় মাছ ও কাঁকড়ার বাজারেও প্রভাব পড়েছে। কাজ না পেয়ে অনেক জেলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
উপকূলের বনজীবীদের দাবি, দ্রুত সুন্দরবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় সুন্দরবননির্ভর হাজারো পরিবার চরম সংকটে পড়বে।