বাংলাদেশে গানম্যান বা বডিগার্ড দেওয়া হয় মূলত ব্যক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের ভিত্তিতে। এটি সবার জন্য স্বাভাবিক অধিকার নয়। সরকার বিশেষ বিবেচনায় কাউকে গানম্যান দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাইলে কারও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি মনে হলে তাকে গানম্যান দিতে পারে। রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকলে বা কেউ গুরুত্বপূর্ণ মামলার সাক্ষী হলে সরকার নিজ উদ্যোগেও নিরাপত্তা দিতে পারে। এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।
পুলিশ সদরদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সাধারণ কোনো ব্যক্তি গানম্যান চাইলে লিখিতভাবে পুলিশের কাছে বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। আবেদন পাওয়ার পর গোয়েন্দা সংস্থা বা স্পেশাল ব্রাঞ্চ তদন্ত করে দেখে, আবেদনকারীর সত্যিই নিরাপত্তা প্রয়োজন আছে কি না, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তিনি গানম্যান চাইছেন। এই যাচাই প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং কঠোর।
সাধারণত মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রটেকশন ইউনিট থেকে বডিগার্ড এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ থেকে গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ জানান, সব যাচাই শেষে প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্য নিয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে যাঁর জন্য গানম্যান দেওয়া হচ্ছে, তাঁর মতামতও গুরুত্ব পায়। সরকার নিয়োগ দিলেও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনায় নেওয়া হয়।
গানম্যানরা সরকারি অস্ত্র ব্যবহার করেন এবং তাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ গুলি বরাদ্দ থাকে। গানম্যানের সব খরচ সরকার বহন করে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে আনসার ভিডিপির সদস্যদের নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে নিরাপত্তার কাজে নিতে পারে।
কে এবং কেন গানম্যান পান
রাষ্ট্রীয় পদ বা প্রটোকলের কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি গানম্যান পান। এদের মধ্যে রয়েছেন—রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সচিব বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনীর প্রধানরা।
পুলিশের সাবেক প্রধান নুরুল হুদা বলেন, কেউ চাইলে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা আবেদন করতে পারেন, তবে গানম্যান দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সময় বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে। তবে যাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে, তাঁর ঝুঁকির বিষয়টি বাস্তব হতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, কেউ চাইলে আদালতের কাছেও পুলিশি নিরাপত্তা বা গানম্যান চেয়ে আবেদন করতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তবে কাউকে গানম্যান দেওয়া হবে কি না—সে সিদ্ধান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেয়।
অনেকে নিজের বেতনভুক্ত লোক দিয়েও গানম্যানের কাজ করান। সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির নামে অস্ত্রের লাইসেন্স থাকতে হবে, অথবা নিয়োগকর্তার লাইসেন্সে তাকে ব্যবহারকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া সরকার অনুমোদিত বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানি থেকেও নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে গানম্যান নেওয়া যায়। তবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের জন্য জেলা প্রশাসকের বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন।
আগেও বাংলাদেশে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিশেষ বিবেচনায় গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে লেখক, প্রকাশক ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনায় সরকার অনেকের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় ২৬২ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তায় সাদা পোশাকে গানম্যান নিয়োগ করা হয়েছিল।