এদেশে নৌকা বাইচ গণবিনোদন হিসেবে কবে প্রচলন হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় নি। তবে এ বিষয়ে দুটি জনশ্রুতি রয়েছে। একটি জনশ্রুতি জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে। জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়। এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এ থেকে কালক্রমে নৌকা বাইচ শুরু। দ্বিতীয় জনশ্রুতি পীর গাজীকে কেন্দ্র করে। ১৮ শতকের শুরুর দিকে কোনো এক গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ে থাকা তার ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোনো নৌকা ছিল না। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙ্গি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখনই নৌকাটি মাঝ নদীতে এলো তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হলো। নদী ফুলেফেঁপে উঠলো। তখন চারপাশে যত নৌকা ছিল তারা খবর পেয়ে ছুটে আসে। তখন সারি সারি নৌকা একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। এ থেকেই নৌকা বাইচের গোড়াপত্তন হয়। মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌকা বাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অনেকে মনে করেন, নবাব বাদশাহদের নৌবাহিনী থেকেই নৌকা বাইচের গোড়াপত্তন হয়।
ঐতিহ্য অব্যাহত রাখতে আগামী ৫ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার দেওতলা ইছামতি নদীতে অনুষ্ঠিত হবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ।
দেওতলা নবারুণ সংঘ ও নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন ইটালি প্রবাসি মোঃ কামাল হোসেন তিনি নারির টানে প্রতিবছর ইটালি প্রবাসী জীবর ছেড়ে গ্রাম বাংলা ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ মনের মাধুরিয়ে দিয়ে আয়োজন করেন।
অংশ নিতে বিশালাকৃতির ঘাসি নৌকা, খেলনা নৌকা, কোষা নৌকা অংশগ্রহণ করতে রেজিস্ট্রেশন করে। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর, সিংগাইর এবং ঢাকা জেলার দোহার-নবাবগঞ্জের আকর্ষণীয় বিশালাকৃতির নৌকা অংশগ্রহণ করে। পুরো এলাকাজুড়ে চলে ব্যাপক প্রস্তুতি।
এক সময় ঢাকার নবাবগঞ্জে ভাদ্র মাস এলেই শুরু হতো গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। পুরো এক মাসব্যাপী ইছামতি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে এলাকাবাসীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হতো এ নৌকা বাইচ। পুরো উপজেলায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করতো। প্রতিটি বাসায় পিঠা-পুলি বানানোর ধুম পড়ে যেতো। বিশেষ করে তাল দিয়ে বানানো পোয়া পিঠা সবার বাড়িতে ছিল বাধ্যতামূলক। বিকাল হলে দাদা, নানা, চাচাদের সঙ্গে বাইচ দেখতে ছোট্ট ছেলে মেয়েরাও বায়না ধরতো। বাধ্য হয়ে ডিঙ্গি নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে তাদেরকে নিয়ে নৌকা বাইচ দেখতে যেতেন। অনেক পরিবারে আবার বাড়ির সবাই মিলে নৌকা বাইচ দেখতে হাজির হতো।
কিন্তু গত ১০/১২ বছর ধরে এ ঐতিহ্যে ভাটা পড়েছে। এর মূল কারণ বর্ষা মৌসুমে ইছামতি নদীতে এখন আর সেই আগের মতো পর্যাপ্ত পানি থাকে না। নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে কচুরিপানায় ভরপুর থাকে। এতকিছুর পরেও এলাকাবাসী কচুরিপানা অবমুক্ত করে ইছামতি নদীর কোনো না কোনো পয়েন্টে নৌকা বাইচের আয়োজন করেন। বিশেষ করে উপজেলার দেওতলা, কলাকোপা, দিঘীরপাড়, ভাঙ্গাভিটা, মরিচা, আলমপুর, কোমরগঞ্জ, শোল্লা,পাড়াগ্রাম, পাতিলঝাপ, কৈলাইল, সাভারের হাউজিং, রাধাকান্তপুর, খানেপুর ও ধাপাড়ী সহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়।