ন্তানকে এক হাতে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছেন মা। অন্য হাত দিয়ে আগলে রেখেছেন সন্তানের মাথা। পিঠে ঝোলানো ব্যাগ। চারপাশ থেকে উড়ে আসছে ইট-পাটকেল। বাঁচার তাগিদে সন্তানকে নিয়ে ছুটছেন এক মা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এমন হৃদয়স্পর্শী ছবির পেছনের গল্প সামনে এসেছে।
ছবিতে থাকা নারীর নাম সিমু সরকার। তাঁর কোলে থাকা শিশুটির নাম শুভ সরকার। তাঁদের বাড়ি মাদারীপুর জেলার টেকেরহাট এলাকায়। সন্তানের চোখের চিকিৎসা করাতে ঢাকায় এসে মিরপুর-১০ এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে চরম বিপদের মুখে পড়েন তাঁরা। নিরাপদে সেখান থেকে বেরিয়ে এলেও এখনো মা-ছেলের মন থেকে আতঙ্ক কাটেনি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে কালবেলা অনলাইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিমু সরকার সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
গত রোববার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে সন্তানকে আগলে ধরে দৌড়ানোর সময় মা-ছেলের ছবিটি তোলেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রধান আলোকচিত্রী সৈয়দ জাকির হোসেন। পরে ছবিটি সংবাদমাধ্যমটির শিক্ষাবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম টিবিএস গ্র্যাজুয়েটসের ফেসবুক পেজ ও আলোকচিত্রীর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সিমু সরকার জানান, তাঁর ছেলে শুভর চোখে অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে। চোখ লাল হয়ে যায়, পানি পড়ে এবং ফুলে ওঠে। গ্রামের বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে নিয়েও কোনো সুফল না পাওয়ায় ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন উন্নত চিকিৎসার আশায়।
তিনি বলেন, ঢাকায় আসার পর মিরপুর-১০ এলাকায় তাঁদের গাড়ি থামিয়ে দেওয়া হয়। পরে কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবেন, তা বুঝতে না পেরে গাড়ির খোঁজে হাঁটতে শুরু করেন। একপর্যায়ে একটি সড়কে ঢুকে পড়লে সংঘর্ষে জড়িত লোকজনের মধ্যে আটকা পড়েন তাঁরা।
সেদিনের ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে সিমু সরকার বলেন, ‘চারপাশ থেকে ইট-পাটকেল, বোমা, তারপর গুলি ছুড়তে শুরু করল। তখন আমার খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল ছেলেকে নিয়ে। আমি কী করব, সন্তানকে কীভাবে বাঁচাব—কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।’
সিমুর সঙ্গে ছিলেন তাঁর বোন ও ভাগ্নে। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠলে সবাইকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি বললাম, বোন, দৌড় দিয়ে আগে এখান থেকে বের হই, নইলে তো আমরা সবাই মরে যাব।’
এরপর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে দৌড় দেন তিনি। এ সময় ইট বা পাটকেলের আঘাতে তাঁর পায়ে আঘাত লাগে। এখনো পা ফুলে রয়েছে বলে জানান তিনি।
সিমু বলেন, ভয়ে তাঁর গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে একজন অপরিচিত ব্যক্তি তাঁদের বিপদে এগিয়ে আসেন। তিনি মা-ছেলেসহ সবাইকে উদ্ধার করে নিজের বাসায় নিয়ে যান এবং আশ্রয় দেন। এখনো তাঁরা ওই ব্যক্তির বাসাতেই অবস্থান করছেন।
উদ্ধারকারী ব্যক্তি জানান, বিপদের মধ্যে পড়া পরিবারটিকে দেখে তিনি এগিয়ে যান। দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করে নিজের বাসায় নিয়ে আসেন। বর্তমানে তাঁদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকের কাছেও নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এর আগে ওই পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনো পরিচয় ছিল না।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে শিশু শুভ ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। চিকিৎসার জন্য বাইরে বের হতেও ভয় পাচ্ছিল সে। ছেলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সিমু সরকার বলেন, ‘অনেক বুঝিয়ে ও সাহস দিয়ে শেষ পর্যন্ত সন্তানকে নিয়ে আবার বাইরে বের হয়েছি।’
সন্তানের সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য সবার কাছে আশীর্বাদ চেয়ে তিনি বলেন, ‘সবাই আমার সন্তানের জন্য একটু আশীর্বাদ করবেন, যেন কোনো বিপদে না পড়ে। আমি যেন সব বিপদ থেকে আমার সন্তানকে আগলে রাখতে পারি, রক্ষা করতে পারি।’
একদিকে সন্তানের অসুস্থতা, অন্যদিকে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সংঘর্ষের স্মৃতি—সব মিলিয়ে এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি সিমু ও তাঁর ছোট্ট সন্তান শুভ। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন, তা কখনো কল্পনাও করেননি এই মা।
