বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে নিভে যায় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশের এক উজ্জ্বল প্রদীপ। কবি সারাজীবন শোষিতের মুক্তি, সাম্য আর মানবতার জয়গান গেয়ে গেছেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা।
কবির শৈশব থেকে বিপ্লবী জীবন
১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের চুরুলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া নজরুল শৈশবেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। ছোটবেলাতেই মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করেছেন, লেটো দলে গান লিখে ও অভিনয় করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি কখনো কাকের বাসা থেকে ডিম কুড়িয়ে খাওয়া, আবার কখনো রেলওয়ে ক্যান্টিনে চাকরি করা—সবকিছুতেই জীবনের সংগ্রামের স্বাদ পেয়েছেন তিনি। কৈশোরে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের নানা স্থানে ঘুরেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় বিদ্রোহ ও বৈশ্বিক মানবতার চেতনা গড়ে দেয়।
বিদ্রোহী সাহিত্য ও সাংবাদিকতা
১৯২২ সালে প্রকাশিত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ তাঁকে এনে দেয় “বিদ্রোহী কবি” উপাধি। তাতে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল অবিচল মুক্তির ডাক। তিনি নবযুগ, ধূমকেতু ও লাঙল পত্রিকা সম্পাদনা করে সমাজকে জাগ্রত করেন। ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যার ঘোষণা নিপীড়িত জাতির মুক্তির অগ্নিঘোষ হয়ে ওঠে। তাঁর ‘ভগ্নি-তরঙ্গ’, ‘সমকাল’, ‘আগমনী’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ বারবার ব্রিটিশ শাসকের রোষানলে পড়ে বাজেয়াপ্ত হয়, কবি নিজেও জেল খাটেন।
সংগীতে অনন্য অবদান
নজরুল ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার ও সুরকার। চার হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন তিনি। নজরুলগীতিতে প্রেম, দেশপ্রেম, সাম্যবাদ, ইসলামী চেতনা, শ্যামাসঙ্গীত ও কাওয়ালির সমন্বয় বাংলা গানে নতুন মাত্রা দেয়। তিনি ইসলামী গানকে জনপ্রিয় করেন, আবার শ্যামাসঙ্গীতে অনন্য অবদান রাখেন। এজন্যই তাঁকে বলা হয় “গানের পাখি।”
চলচ্চিত্র ও অভিনয়
বাংলা চলচ্চিত্রেও নজরুল ছিলেন সক্রিয়। ধ্রুব (১৯৩৪) ও ধূপছায়া (১৯৩৬) সিনেমায় তিনি অভিনয়, সুর ও গীত রচনা করেন। নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাসেও তিনি সমান পারদর্শিতা দেখান। তাঁর সৃষ্টিতে প্রতিফলিত হয়েছে ন্যায়বিচারের দাবি, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং সাম্যের দৃঢ় অঙ্গীকার।
ব্যক্তিজীবন ও উত্তরাধিকার
চার পুত্রের মধ্যে সংগীতশিল্পী বুলবুলের অকালমৃত্যু তাঁকে শোকাহত করে তোলে। অন্য পুত্র সব্যসাচী নজরুল পিতার সৃষ্টিকে লালন করে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদান রাখেন। স্বাধীনতার সময় মুক্তিকামী বাঙালি তাঁর গান ও কবিতায় অনুপ্রেরণা পেয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগীত চর্চায় নজরুলগীতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে বাকশক্তি হারান তিনি এবং প্রায় তিন দশক নীরব জীবনে বন্দি থাকেন। ১৯৭২ সালে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তাঁকে জাতীয় কবি ঘোষণা করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডি-লিট ডিগ্রি দেয় এবং রাষ্ট্রীয় ভাতা প্রদান করা হয়।
মৃত্যু ও শ্রদ্ধা
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট, ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে। তাঁর সমাধি আজও বাঙালির শ্রদ্ধা ও প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু।
আজকের প্রজন্মের কাছে নজরুল
আজকের প্রজন্মের কাছে নজরুল কেবল ইতিহাস নন; তিনি জীবন্ত প্রেরণা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস, সাম্যের ডাক, মানবতার জয়গান—সবই তাঁর সাহিত্য থেকে আহ্বান জানায়। ডিজিটাল যুগেও নজরুল শেখান, শোষিতের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবতার কাজ।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী শুধু স্মরণের নয়; এটি প্রতিজ্ঞার দিন। আমাদের শপথ নিতে হবে—আমরা নজরুলের চেতনায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ব, সাম্যের সমাজ গড়ব এবং মানবতার জয়গান গাইব। তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে যখন যথাযথ আয়োজনের ঘাটতি চোখে পড়ে, তখন আগামী প্রজন্মের কাছে নজরুলকে তুলে ধরার দায়িত্ব আসলে কার?