বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হবে, হাল ধরবে পরিবারের। গ্রামবাসীও আশা করত, তাদের ছেলে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে। তাই ছেলের পড়াশোনার খরচ বহনে বাবা বেছে নেন কঠোর পরিশ্রমের কাজ। কখনো রিকশা চালিয়ে, কখনো কৃষি শ্রমিকের কাজ করে খরচ বহন করছিলেন তিনি।
কিন্তু ছেলের অকাল মৃত্যুতে শেষ হয়ে গেছে সেই স্বপ্ন।
গত বুধবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জগন্নাথ হলের সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য ভবনের দশতলার ছাদ থেকে ভবনের পেছনে মেঝেতে পড়ে গুরুতর আহত হন লিমন কুমার রায় (২০)। হলের কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা তাঁকে ঢামেক হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র এবং নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের দোলাপাড়া গ্রামের প্রভাষ চন্দ্র রায় ও নীলা রানী রায় দম্পতির ছেলে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে লিমন বড়।
এদিকে লিমন কুমারের মৃত্যুর ঘটনায় বুধবার ঢাকার শাহবাগ থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছেন তাঁর চাচা। ময়নাতদন্ত শেষে লিমনের মরদেহ গতকাল দুপুরে তাঁর বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মামলা ও ময়নাতদন্তের বিষয়টি কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মিহির লাল সাহা ও শাহবাগ থানার ওসি নূর মোহাম্মদ।
মিহির লাল সাহা বলেন, ‘পরিবার লিমনের মরদেহ নিয়ে নীলফামারী রওনা করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সে আত্মহত্যা করেছে। তার বন্ধুদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি, সে কিছুদিন ধরে হতাশায় ছিল। ’ মিহির লাল সাহা ও ওসি নূর মোহাম্মদ বলেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
এলাকাবাসী জানায়, লিমন ছোটবেলা থেকেই ছিল মেধাবী। গ্রামের বিদ্যালয়ে পড়ে এসএসসিতে জিপিএ ৫ অর্জন করে ভর্তি হন রংপুরের কারমাইকেল কলেজে। সেখানে এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পান। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। তাঁর ছোট ভাই সুমন রায় দশম ও সবার ছোট বোন অর্পিতা রায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। মা নীলা রানী রায় গৃহিণী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী বাবা। পরিবারের সম্বল বলতে আছে বাড়িভিটার চার শতক জমি।
বুধবার লিমনের মৃত্যুর খবর এলে পরিবারে শুরু হয় আহাজারি। গতকাল দুপুরে তাঁর বাড়িতে গিয়েও দেখা গেছে মাতম চলছে। মা-বাবা, ভাই-বোনসহ স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। আহাজারি ছড়িয়ে পড়ে গোটা গ্রামে। গ্রামবাসীও শোকার্ত।
মা নীলা রানী বিলাপ করে জানান, লিমন সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে মোবাইল ফোনে কথা বলেছিলেন মায়ের সঙ্গে। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মা তোমরা কেমন আছো?’ মা বলেছিলেন, ‘আমরা ভালো আছি, তুমি কেমন আছো?’ লিমন বলেছিলেন, ‘মা, আমার গলা বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে, কেমন ভয় ভয় লাগছে। ’ এ সময় মা তাঁকে শরবত খাওয়া ও ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাবা মুই পরে কথা কইম, এলা গরু-ছাগল ঘরোত ঢুকাছো। ’
লিমনের বাবা প্রভাষ চন্দ্র রায় ছেলের মৃত্যুর খবরে ছুটে যান ঢাকায়। মোবাইল ফোনে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছেলে কইছিল লেখাপড়া শিখি শিক্ষক হোবে। অনেক কষ্ট করিও তার আবদার পূরণ করিবার চেষ্টা করিছু। ভাবিছিনু ছেলে বড় হইলে সংসারের হাল ধরিবে, মোর কষ্ট হালকা হোবে। কিন্তু মোর সে আশা আর পূরণ হইল না। ’
লিমনের কাকা নারায়ণ চন্দ্র রায় বলেন, ‘লিমন আত্মহত্যা করতে পারে না। কারণ সে মানুষকে আত্মহত্যা না করার পরামর্শ দিত। ’
প্রতিবেশী বুজঙ্গ নাথ রায় (৪৫) বলেন, ‘লিমন বাড়িতে আসলেই প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর সকলের আশা ছিল লিমন একদিন অনেক বড় হয়ে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে। ’