বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর শেষ অধ্যায় বিজয়া দশমী। আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর উৎসবের কয়েকটি দিন কাটানোর পর
২১ অক্টোবর, বুধবার, অশ্রুসজল চোখে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানালেন অগণিত ভক্ত। কলকাতার বাবুঘাট-সহ বিভিন্ন ঘাটে সকাল থেকেই শুরু হয়েছে প্রতিমা নিরঞ্জন। ঘাটে ঘাটে ধ্বনিত হচ্ছে একটাই আকুল প্রার্থনা—‘আসছে বছর আবার হবে’।
বছরভর অপেক্ষার পর কয়েক দিনের আনন্দ নিয়ে মর্ত্যে আসেন মা দুর্গা। আবার বিজয়ার দিনে ভক্তদের মনে বিষাদের সুর ছড়িয়ে কৈলাসের পথে বিদায় নেন তিনি। তাই প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে একদিকে যেমন রয়েছে উৎসবের আনন্দ, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে মাকে বিদায় জানানোর গভীর আবেগ।
সকাল থেকে শুরু প্রতিমা নিরঞ্জন, দুপুরে বাড়ল ক্লাবের প্রতিমার ভিড়
সকাল থেকেই কলকাতার বিভিন্ন ঘাটে একে একে বাড়ির পুজোর প্রতিমা নিয়ে আসতে দেখা যায় ভক্তদের। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যস্ততা। দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন ক্লাবের পুজোর প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা শুরু হয়। সারিবদ্ধভাবে প্রতিমা নিয়ে পুজো উদ্যোক্তারা এগিয়ে যান বাবুঘাটের দিকে।
কোথাও ঢাকের তালে তালে চলছে শোভাযাত্রা, কোথাও আবার সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন মহিলারা। লালপাড় সাদা শাড়িতে সজ্জিত মহিলাদের সিঁদুর মেখে নাচতে নাচতে মায়ের বিদায়যাত্রায় অংশ নিতে দেখা যায়। ঢাকের আওয়াজ, উলুধ্বনি এবং ‘আসছে বছর আবার হবে’ স্লোগানে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে ঘাট সংলগ্ন এলাকা।
সন্ধ্যা নামতেই বাবুঘাটে উপচে পড়ল ভিড়
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই বাবুঘাট-সহ কলকাতার বিভিন্ন বিসর্জন ঘাটে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। প্রতিমা নিরঞ্জন দেখার জন্য বহু সাধারণ মানুষ ঘাটে এসে জড়ো হন। রাত যত বাড়ে, প্রতিমা নিয়ে আসা গাড়ির সংখ্যাও তত বাড়তে থাকে।
ঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য গাড়িগুলিকে পর্যায়ক্রমে প্রবেশ করানো হয়। একটি প্রতিমার বিসর্জন সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট গাড়িকে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর পরবর্তী প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য ঘাটে প্রবেশ করে। এইভাবে ধাপে ধাপে বিসর্জনের কাজ চালানো হয়।
নিরাপত্তায় পুলিশ ও প্রশাসন, মাইকিং করে সতর্কবার্তা
প্রতিমা নিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা বা দুর্ঘটনা না ঘটে, তার জন্য তৎপর রয়েছে পুলিশ, প্রশাসন এবং কলকাতা পুরসভার (কেএমসি) আধিকারিকেরা। ঘাটগুলিতে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার রাখা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক এবং পুলিশকর্মীদের সাধারণ মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়।
বারবার মাইকিং করে দর্শনার্থীদের সতর্ক করা হচ্ছে। প্রতিমার সঙ্গে দু’জনের বেশি ব্যক্তিকে ঘাটে প্রবেশ না করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশুদের নিয়ে বিসর্জনের ঘাটে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিমা নিরঞ্জনের কাজ শেষ হলে দ্রুত উপরে উঠে আসার জন্যও অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বাঁশি বাজিয়ে দর্শনার্থীদের নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ানোর নির্দেশ দিচ্ছেন, যাতে বিসর্জনের কাজে কোনও বাধা সৃষ্টি না হয় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বজায় থাকে।
প্রশাসনের তরফে বারবার জানানো হচ্ছে, কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন বা অযথা ভিড় না করেন। সকলের সহযোগিতায় যাতে সুষ্ঠুভাবে প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন হয় এবং মানুষ নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই চলছে নজরদারি।
চোরবাগানের ঘটনার ছায়া পুজোর আনন্দে
এ বছরের দুর্গাপুজোয় চোরবাগানের ঘটনাকে ঘিরেও উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনার প্রভাবে বেশ কয়েকটি বড় পুজোমণ্ডপ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। ফলে পুজোর দিনগুলিতে পুজো উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সাধারণ দর্শনার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দেয়। উৎসবের আনন্দের মধ্যেও সেই ঘটনার প্রভাব অনেকের মনে ছাপ ফেলেছিল।
‘আসছে বছর আবার হবে’—এই আশাতেই শেষ হল উৎসব
বিজয়া দশমীর দিনে মাকে বিদায় জানিয়ে ভারাক্রান্ত মনে বাড়ি ফিরছেন অসংখ্য মানুষ। সিঁদুর খেলা, ঢাকের বাদ্যি, শোভাযাত্রা এবং বিসর্জনের আবেগঘন মুহূর্তের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে আরও একটি দুর্গাপুজো।
মা দুর্গা বিসর্জনে বিদায় নিলেও ভক্তদের মনে থেকে যায় তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষা। তাই বিষাদের মাঝেও সকলের কণ্ঠে একটাই প্রার্থনা—‘আসছে বছর আবার হবে’।
সকলকে জানাই শুভ বিজয়ার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
