চোরবাগান দুর্গোৎসবের ৯১তম বর্ষে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়েছে শোক ও চাঞ্চল্য। অভিযোগ, শনিবার সন্ধ্যা প্রায় ৭টা নাগাদ বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। সেই সময়ই পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় ২৫ জনের মৃত্যুর দাবি করা হয়েছে। বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলেও জানা গিয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা ও পরিচয় সরকারি সূত্রে যাচাই করা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয়জনদের খোঁজে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন বহু পরিবারের সদস্য। স্বজনহারা মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। চোখের সামনে বন্ধু ও পরিচিতদের হারিয়ে অনেকেই শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন। উৎসবের আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হয় গভীর বিষাদে।
ভিড় নিয়ন্ত্রণে গাফিলতির অভিযোগ
এত বড় দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটল, ভিড় সামলানোর জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং প্রশাসন ও পুজো কমিটির ভূমিকা কী ছিল—তা নিয়ে উঠতে শুরু করেছে একাধিক প্রশ্ন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, একটি বইয়ের স্টল ভাঙার ক্ষেত্রে প্রশাসন বুলডোজার নিয়ে তৎপর হলেও, পুজোমণ্ডপে বিপুল ভিড় সামলানোর ক্ষেত্রে সেই তৎপরতা দেখা যায়নি। তাঁদের আরও অভিযোগ, ঘটনাস্থলে প্রশাসনিক আধিকারিকদের তুলনায় হলুদ গেঞ্জি পরিহিত স্বেচ্ছাসেবকদের সংখ্যাই বেশি চোখে পড়েছে। পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল কি না এবং স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের ক্ষেত্রে কী নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
শুধু চোরবাগান নয়, শহরের আরও কয়েকটি নামী পুজোমণ্ডপেও ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ছবি সামনে এসেছে বলে দাবি করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা।
পুজো কমিটি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
চোরবাগান পুজো কমিটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুজো কমিটিতে জোড়াসাঁকোর বিধায়ক বিজয় ওঝা, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো দেবদ্বীপ অধিকারী এবং বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ-সহ আরও কয়েকজন যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গিয়েছে, আগের কমিটির সদস্যদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির সাংগঠনিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা যথাযথ ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দুর্ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা কমিটিকে দায়ী করার আগে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন মহল।
আহতদের হাসপাতালে স্থানান্তর, ঘটনাস্থলে রাজনৈতিক নেতারা
দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। মৃতদের মধ্যে পুরুষ, মহিলা ও এক শিশুর থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মৃতের মোট সংখ্যা এবং লিঙ্গভিত্তিক হিসাবের মধ্যে অসংগতি থাকায় চূড়ান্ত তথ্যের জন্য সরকারি বিবৃতির অপেক্ষা জরুরি।
ঘটনার খবর পেয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। তাঁদের মধ্যে কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, আশুতোষ চ্যাটার্জি এবং মহম্মদ সেলিম-সহ অন্যান্য নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা জানা গিয়েছে। খবর পাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ঘটনাস্থলে পৌঁছন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিন নির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে তিনি চিকিৎসাকেন্দ্রেও যান বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে উদ্ধারকাজে ঝাঁপ
দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন বলে জানা গিয়েছে। আহতদের হাসপাতালে পাঠানো এবং বিপর্যস্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি এগিয়ে আসেন।
একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ীদের শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ এবং মৃতদের নাম-পরিচয় প্রকাশের দাবি জোরালো হয়েছে। পুজোমণ্ডপে পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী মোতায়েন না করে কেন স্বেচ্ছাসেবকদের উপর বেশি নির্ভর করা হয়েছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
আর্থিক ক্ষতিপূরণের ঘোষণা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে দু’লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তার কথাও বলা হয়েছে। তবে এই আর্থিক সহায়তার ঘোষণা এবং তার শর্তাবলি সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শোকের আবহে একাধিক প্রশ্ন
চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনাকে ঘিরে এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—দুর্ঘটনার দায় কার? পুজো কমিটির পক্ষ থেকে কী কী নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? অতিরিক্ত ভিড়ের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল কি না? ঘটনার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হবে?
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়েছে। তবে শোকের পাশাপাশি এলাকাবাসীর দাবি, শুধু ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করলেই চলবে না—দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ প্রকাশ্যে আনতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় রুখতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৯১ বছরের দুর্গোৎসবের আনন্দকে ম্লান করে দেওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনার পর এখন সকলের নজর তদন্তের দিকে। কীভাবে ঘটল এই বিপর্যয়, কোথায় ছিল নিরাপত্তার ঘাটতি এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে কী পদক্ষেপ করা হবে—তার উত্তরই এখন প্রত্যাশা করছেন সাধারণ মানুষ।
