বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে আবারও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলেও আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাত এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত শনিবার থেকে এ মামলায় চার দিনের রিমান্ডে ছিলেন দীপ। মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ৩টার দিকে তাকে রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে হাজির করা হয়।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, চার দিনের রিমান্ডে আসামি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও অত্যন্ত কৌশলে অনেক তথ্য গোপন করেছেন। এ কারণে তাকে পুনরায় সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আসামিকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিলের আবেদন জানান। শুনানিতে আইনজীবী মোতাসিম বিল্লাহ বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ জোর করে আসামিকে অপরাধী প্রমাণ করতে চাইছে। বারবার রিমান্ডে নিয়ে চাপ প্রয়োগ করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার রাতে ভুক্তভোগী তাহসিফ নিজেই দীপকে ডেকেছিলেন কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত দীপের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে
রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, ঘটনার দিন ভুক্তভোগী তাহসিফ সৌরিকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ স্বীকার করেছেন, তাহসিফ সৌরি তার সিনিয়র বড় ভাই ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ।
মামলার তদন্তের স্বার্থে এবং আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারেন—এমন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে জানানো হয়।
যেভাবে নিখোঁজ হন তাহসিফ
মামলার অভিযোগ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরি। রাত গভীর হলেও তিনি বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
এ সময় তার মা বারবার ফোন করলে তাহসিফ কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় ফিরবেন বলে জানান। পরে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তার ফোন থেকে মায়ের ফোনে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’। তবে রাত পেরিয়ে পরদিন বিকেল হলেও তিনি বাসায় ফেরেননি।
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৫টা ২০ মিনিটে উত্তরখান থেকে নৌ পুলিশ ফোন করে তাহসিফের বাবাকে জানায়, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তার ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে ২৯ অক্টোবর দুপুরে নৌ পুলিশ পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে। একই দিন বিকেলে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাকে দাফন করা হয়।
বাবার করা মামলায় গ্রেপ্তার দীপ
ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় গত ৩০ অক্টোবর রাতে রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।
মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার পর দীপ নামে তার ছেলের এক জুনিয়রের ডাকে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ হলেও তিনি আর বাসায় ফেরেননি।
এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পরে মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা উদ্ঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
