ঢাকাWednesday , 28 October 2026
  • অন্যান্য
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন ও ন্যায়
  4. খেলা ধুলা
  5. জাতীয়
  6. জীবন যাপন
  7. টাকা বা ডলারের মান হ্রাস বা বৃদ্ধি
  8. ট্রাফিক সার্জেন্টে
  9. ধর্মীয় রীতিনীতি
  10. পার্ক
  11. প্রশাসন
  12. ফিলিস্তিন
  13. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  14. বিনোদন
  15. বিলাসী
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চায়নাম্যান স্পিনার থেকে অপরাধ জগতের আলোচিত নাম ডেভিড ইমন

ডেস্ক রিপোর্ট
October 28, 2026 11:59 pm
Link Copied!

ব্যাট-বল হাতে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন মোবারক হোসেন ইমন। চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই ইমনের নাম জড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের নানা ঘটনায়। হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলার আসামি ডেভিড ইমনকে শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

#New_Classic_Event_Management

পুলিশের দাবি, গোঁফ কেটে ছদ্মবেশ ধারণ করে সহযোগীদের নিয়ে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের নয়টি দলের যৌথ অভিযানে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার অন্য তিনজন হলেন ঢাকার জুরাইনের আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫), কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের মো. শামীম (২৮) এবং নোয়াখালীর সাহারপাড়ার সাফায়েত হোসেন (২৮)।


যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ যৌথভাবে অংশ নেয়। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, জেলা পুলিশের একাধিক দলের দীর্ঘদিনের নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে ডেভিড ইমন ও তাঁর সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাঁদের নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় পুলিশ।

পুলিশ সুপার আরও জানান, ডেভিড ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান আলমকে গ্রেপ্তার করতে একই সময়ে পৃথক অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। তাঁকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে ডেভিড ইমনকে খোঁজা হচ্ছিল। গ্রেপ্তারের আগে প্রায় সাত দিন ধরে তাঁর অবস্থান ও চলাচলের ওপর নজরদারি চালানো হয়।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের একটি কৃষক পরিবারে জন্ম মোবারক হোসেন ইমনের। তাঁর বাবা মো. মুসা। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইমন ফটিকছড়িতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উপজেলা চেয়ারম্যান তৈয়বের অনুসারী হিসেবেও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা যেত বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। পরবর্তী সময়ে তিনি ওই রাজনৈতিক পরিসর থেকে সরে অন্য পথে যুক্ত হন বলে দাবি তাঁদের।

ছোটবেলা থেকেই নানা সংকটের মধ্যে বেড়ে ওঠা ইমনের লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেটের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। এলাকার মাঠে ক্রিকেট খেলা শুরু করে একপর্যায়ে চট্টগ্রাম শহরে আসেন তিনি। ২০১৯ সালের দিকে যোগ দেন ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে। বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউরী এলাকায় নিয়মিত অনুশীলন করতেন। বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের বোলিং অনুসরণ করতেন তিনি। ক্রিকেট নিয়েই ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর।

ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ আমিনুল হক বলেন, ইমন শান্ত স্বভাবের ছিলেন, বেশি কথা বলতেন না। নিয়মিত অনুশীলন করতেন এবং ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে একাডেমিতে এসেছিলেন। বোলিংয়ে তাঁর সম্ভাবনা ছিল। তবে করোনার সময়ের পর থেকে তাঁকে আর একাডেমিতে দেখা যায়নি। পরে গণমাধ্যমে ‘ডেভিড ইমন’ নামে তাঁর পরিচিতি দেখে কোচ জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি তাঁর সাবেক শিক্ষার্থী মোবারক হোসেন ইমন।

একাডেমির সাবেক কয়েকজন ক্রিকেটারের ভাষ্য, ইমনের বোলিং নিয়ে কোচদের মধ্যে আশাবাদ ছিল। বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার মতো সামর্থ্যও তাঁর ছিল। তবে পারিবারিক সংকটের কারণে ধীরে ধীরে ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যান তিনি।

পরিচিতদের তথ্য অনুযায়ী, ইমনের বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। পরিবারের সীমিত আয়, বাবার চিকিৎসার খরচ এবং নিজের ক্রিকেট চালিয়ে নেওয়ার চাপ মিলিয়ে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন। একপর্যায়ে নিয়মিত অনুশীলন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ক্রিকেটাঙ্গন থেকে হারিয়ে যান সম্ভাবনাময় এই তরুণ।

ক্রিকেট থেকে সরে যাওয়ার পর কীভাবে ইমন অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। ওই সময় থেকে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।

পুলিশের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যে সাজ্জাদ গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিতি পান ডেভিড ইমন। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা ও চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের তৎপরতার ঘটনায় তাঁর নাম সামনে আসে। জেলার রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি এলাকাতেও এ চক্রের সদস্যদের তৎপরতার তথ্য রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন কারাগারে যাওয়ার পর ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম চক্রটির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি, হামলা ও অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে।

পুলিশের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রসহ ছবি প্রকাশের ঘটনাও ইমনের অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসে।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রামে আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনের নাম আসে। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় আলোচিত জোড়া হত্যা মামলায় তাঁর নাম উঠে আসে। একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাতেও তাঁকে আসামি করা হয়। হত্যা ছাড়াও অস্ত্র, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের বরাতে জানা গেছে।

সর্বশেষ নগরের চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায়ও ডেভিড ইমনের নাম আলোচনায় আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই দুপুরে চন্দনপুরা এলাকায় ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) নামের প্রতিষ্ঠানটিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দাবি, অস্ত্রধারীরা সেখানে ভাঙচুর চালিয়ে নগদ অর্থ নিয়ে যায়। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তে ডেভিড ইমন ও তাঁর সহযোগীদের নাম সামনে আসে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে।

এর আগে নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে ডেভিড ইমনের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরা হলেন মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪)। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আসিফের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও দুই রাউন্ড গুলি এবং আরিফের কাছ থেকে আরও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা নিজেদের ডেভিড ইমনের সহযোগী বলে পরিচয় দিয়েছেন বলে জানায় পুলিশ। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইমনকে গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হয়।

পুলিশ জানায়, সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পর ডেভিড ইমনের অবস্থান শনাক্ত করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি চালানো হয়। একপর্যায়ে তাঁর অবস্থান চট্টগ্রামের বাইরে শনাক্ত হয়। তিনি বারবার অবস্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপনে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলেও দেখানোর চেষ্টা করতেন বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন ডেভিড ইমন। এ তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ যশোর জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালায়। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় যৌথ অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই অভিযানে তাঁর তিন সহযোগী আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল, মো. শামীম ও সাফায়েত হোসেনও গ্রেপ্তার হন।

পুলিশ জানিয়েছে, ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সক্রিয় অপরাধচক্র, অস্ত্রের উৎস, সহযোগীদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন মামলার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Shares

বিনা অনুমতিতে ডিএন বাংলা ডিজিটালের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

প্রযুক্তি সহায়তায়: মুশান্না কম্পিউটার আইটি