ঢাকাThursday , 5 November 2026
  • অন্যান্য
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন ও ন্যায়
  4. খেলা ধুলা
  5. জাতীয়
  6. জীবন যাপন
  7. টাকা বা ডলারের মান হ্রাস বা বৃদ্ধি
  8. ট্রাফিক সার্জেন্টে
  9. ধর্মীয় রীতিনীতি
  10. পার্ক
  11. প্রশাসন
  12. ফিলিস্তিন
  13. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  14. বিনোদন
  15. বিলাসী
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হাইড্রোজেনেই ছুটছে ট্রেন – নেই ডিজেল বা বিদ্যুতের তার

Link Copied!

স্টেশনে এসে থামল একটি ট্রেন। কিন্তু নেই ডিজেল ইঞ্জিনের পরিচিত গর্জন, নেই কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। এমনকি ট্রেনটির মাথার ওপরও নেই কোনো বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। তাহলে কীভাবে চলছে এই ট্রেন?

#New_Classic_Event_Management

উত্তর হলো হাইড্রোজেন। প্রচলিত ডিজেল বা বৈদ্যুতিক ট্রেনের বাইরে নতুন এক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে ভারত। হাইড্রোজেন থেকে ট্রেনের ভেতরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলছে এই ট্রেন। আর এর ফুয়েল সেল প্রযুক্তির সরাসরি উপজাত হিসেবে তৈরি হচ্ছে পানি ও তাপ।

দ্য প্রিন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত হাইড্রোজেন চালিত যাত্রীবাহী ট্রেন প্রযুক্তিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। গত ১৭ জুলাই হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রেলপথে দেশটির প্রথম হাইড্রোজেন চালিত যাত্রীবাহী ট্রেন ‘নমো গ্রিন রেল’-এর যাত্রা শুরু হয়। ১০টি কোচের এই ট্রেনে রয়েছে দুটি হাইড্রোজেন চালিত ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি যাত্রীবাহী কোচ। ট্রেনটির সম্মিলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ কিলোওয়াট।


তবে হাইড্রোজেন সরাসরি ট্রেনের চাকা ঘোরায় না। প্রথমে ফুয়েল সেলের মাধ্যমে হাইড্রোজেনের রাসায়নিক শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়। এরপর সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ট্রেনের বৈদ্যুতিক মোটর চাকা ঘোরায়।

যেভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করে হাইড্রোজেন ট্রেন

হাইড্রোজেন ট্রেনকে সহজভাবে বলা যায় এমন একটি বৈদ্যুতিক ট্রেন, যার চলার জন্য বাইরের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের প্রয়োজন হয় না। কারণ ট্রেনটির নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা রয়েছে।

সাধারণ বৈদ্যুতিক ট্রেন ওভারহেড তার অথবা থার্ড রেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে। কিন্তু হাইড্রোজেন ট্রেন নিজের ভেতরেই ফুয়েল সেলের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

এই প্রক্রিয়ায় ট্রেনের ট্যাংকে সংরক্ষিত হাইড্রোজেনের সঙ্গে বাতাস থেকে নেওয়া অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়। ফুয়েল সেলের ভেতরে হাইড্রোজেন অণু ভেঙে প্রোটন ও ইলেকট্রনে বিভক্ত হয়। প্রোটন বিশেষ মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ইলেকট্রন সরাসরি যেতে পারে না। ফলে ইলেকট্রনকে একটি বাহ্যিক সার্কিটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে হয়। এই ইলেকট্রনের প্রবাহ থেকেই উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ।

উৎপাদিত বিদ্যুৎ ট্রেনের বৈদ্যুতিক মোটরে সরবরাহ করা হয়। মোটর ঘুরে ট্রেনের চাকা চালায়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রচলিত অর্থে কোনো জ্বালানি পোড়ানো হয় না। ফলে ট্রেন চলার সময় এর ফুয়েল সেল থেকে সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় না।

সহজভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি হলো—

হাইড্রোজেন + অক্সিজেন → বিদ্যুৎ + পানি + তাপ।

ফুয়েল সেল থাকার পরও ব্যাটারি কেন?

ফুয়েল সেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলেও ট্রেনের জন্য আলাদা ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। কারণ ট্রেন চলার প্রতিটি মুহূর্তে একই পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না।

স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু, দ্রুত গতি বাড়ানো কিংবা উঁচু পথে চলার সময় বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। আবার নির্দিষ্ট গতিতে চলার সময় বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে।

ফুয়েল সেল সাধারণত ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে বেশি কার্যকর। অন্যদিকে, হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে ব্যাটারি অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহ করে।

ভারতের এই ট্রেনে লিথিয়াম ফেরো ফসফেট বা এলএফপি ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে। ফুয়েল সেল নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে এবং ব্যাটারি অতিরিক্ত শক্তির চাহিদা পূরণে সহায়তা করে।

এ ছাড়া ট্রেন ব্রেক করার সময় পুনরুৎপাদনশীল ব্রেকিং বা রিজেনারেটিভ ব্রেকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে গতিশক্তির একটি অংশ বিদ্যুতে রূপান্তর করে ব্যাটারিতে জমা রাখা যায়।

ট্রেনটির দুই প্রান্তে থাকা দুটি ড্রাইভিং পাওয়ার কারে প্রোপালশন ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটির ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ কিলোওয়াট। ফলে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪০০ কিলোওয়াট। জিন্দ-সোনিপত রুটে ট্রেনটির সর্বোচ্চ পরিচালনগত গতি ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার। যদিও এর নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার।

কোথা থেকে আসে হাইড্রোজেন?

হাইড্রোজেন ট্রেন বাতাস থেকে সরাসরি হাইড্রোজেন সংগ্রহ করতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন বিশেষ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থা।

হরিয়ানার জিন্দে ভারতীয় রেলওয়ে এ ট্রেনের জন্য বিশেষ হাইড্রোজেন উৎপাদন ও সরবরাহকেন্দ্র তৈরি করেছে। সেখানে ইলেক্ট্রোলাইসিস পদ্ধতিতে পানি থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানিকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে আলাদা করা হয়।

এরপর উৎপাদিত হাইড্রোজেন উচ্চ চাপে সংকুচিত করে বিশেষ ট্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়। হাইড্রোজেন অত্যন্ত হালকা গ্যাস হওয়ায় অল্প জায়গায় বেশি পরিমাণে সংরক্ষণের জন্য উচ্চচাপের ব্যবস্থা প্রয়োজন।

জিন্দের এই কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার কেজি হাইড্রোজেন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে গ্যাসটি সর্বোচ্চ ৫০০ বার চাপে সংরক্ষণ করা হয় এবং ট্রেনের ট্যাংকে ৩৫০ বার চাপে সরবরাহ করা হয়।

বিশেষায়িত রিফুয়েলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রেনের সিলিন্ডারে হাইড্রোজেন ভরা হয়। যাত্রাপথে সেখান থেকে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলে সরবরাহ করা হয় এবং তা বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়।

দাহ্য হাইড্রোজেন কতটা নিরাপদ?

হাইড্রোজেন অত্যন্ত দাহ্য গ্যাস। বাতাসের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশলে এতে আগুন ধরে যেতে পারে। আবার উচ্চচাপে সংরক্ষণের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

এ কারণে হাইড্রোজেন ট্রেনে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গ্যাস লিক, অতিরিক্ত তাপ, আগুন ও ধোঁয়া শনাক্ত করতে সেন্সর ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি রয়েছে উন্নত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ প্রযুক্তি এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা।

কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইড্রোজেনের সরবরাহ বন্ধ করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

হাইড্রোজেনের অণু অত্যন্ত ছোট হওয়ায় সামান্য ফাঁক দিয়েও গ্যাস বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই শুধু আগুন প্রতিরোধ নয়, কোথাও গ্যাস জমে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করাও এই প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হাইড্রোজেন ট্রেন কি পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব?

হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ট্রেন চলার সময় সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন করে না। এর প্রধান সরাসরি উপজাত পানি ও তাপ। ফলে ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় স্থানীয় বায়ুদূষণ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ট্রেন চলার সময় নির্গমন না থাকলেই পুরো ব্যবস্থাকে শতভাগ দূষণমুক্ত বলা যায় না। কারণ হাইড্রোজেন উৎপাদনেও শক্তির প্রয়োজন হয়।

যদি সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহার করে পানির ইলেক্ট্রোলাইসিসের মাধ্যমে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা হয়, তাহলে সেটিকে গ্রিন হাইড্রোজেন বলা হয়।

অন্যদিকে, কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে হাইড্রোজেন উৎপাদন করলে উৎপাদন পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কার্বন নির্গমন হতে পারে।

অর্থাৎ হাইড্রোজেন ট্রেন পরিবেশের জন্য কতটা উপকারী হবে, তা নির্ভর করবে হাইড্রোজেন উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়ার ওপর।

সব ডিজেল ট্রেনের বিকল্প হচ্ছে না হাইড্রোজেন

প্রযুক্তিটি আকর্ষণীয় হলেও সব রেলপথে হাইড্রোজেন ট্রেন চালানো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নাও হতে পারে।

যেসব রেলপথে ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন রয়েছে, সেখানে সরাসরি বিদ্যুৎ ব্যবহার করাই সাধারণত বেশি দক্ষ ও সাশ্রয়ী। কারণ বিদ্যুৎ থেকে হাইড্রোজেন তৈরি, তা সংকুচিত করে সংরক্ষণ এবং পরে ফুয়েল সেলের মাধ্যমে আবার বিদ্যুতে রূপান্তরের প্রতিটি ধাপে শক্তির অপচয় হয়।

তবে যেসব আঞ্চলিক বা কম ব্যবহৃত রেলপথে ওভারহেড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন ব্যয়বহুল কিংবা কঠিন, সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেন ডিজেলের বিকল্প হতে পারে।

ভারতীয় রেলওয়ে ইতিমধ্যে তাদের ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের ৯৯ শতাংশের বেশি বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে হাইড্রোজেন ট্রেনের লক্ষ্য পুরো বৈদ্যুতিক রেলব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং বিশেষ কিছু রুটে ডিজেলনির্ভরতা কমানো।

তবে গ্রিন হাইড্রোজেনের উৎপাদন খরচ, বিশেষায়িত ট্রেনের দাম, রিফুয়েলিং স্টেশন নির্মাণ এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

ভবিষ্যতে আরও রুটে চলবে কি হাইড্রোজেন ট্রেন?

ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশটির রেলব্যবস্থায় এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা। এর মাধ্যমে শুধু ট্রেন নয়, হাইড্রোজেন উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও রিফুয়েলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তোলা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতীয় রেলওয়ে জানায়, উদ্বোধনের পর ট্রেনটি ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে এবং এতে ৩ হাজার ২০০ লিটারের বেশি ডিজেল সাশ্রয় হয়েছে।

ভবিষ্যতে কালকা-শিমলার মতো ঐতিহাসিক পাহাড়ি রেলপথেও হাইড্রোজেন প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের কথা রয়েছে।

তবে প্রযুক্তিটির বিস্তার নির্ভর করবে পরিচালনগত নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানির দাম, নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে পর্যাপ্ত হাইড্রোজেন উৎপাদনের সক্ষমতার ওপর।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রেল যোগাযোগ মূলত ডিজেল জ্বালানি পোড়ানো কিংবা বাইরে থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। হাইড্রোজেন ট্রেন সেই ব্যবস্থায় নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যেখানে ট্রেন নিজেই নিজের বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে, প্রয়োজন হবে না মাথার ওপর বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন।

তবে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে রেল যোগাযোগের কতটা অংশ দখল করবে, তা নির্ভর করবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর—সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন কতটা সহজলভ্য করা সম্ভব হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Shares

বিনা অনুমতিতে ডিএন বাংলা ডিজিটালের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

প্রযুক্তি সহায়তায়: মুশান্না কম্পিউটার আইটি