উত্তর প্রদেশে বিক্ষোভকারী মুসলমানদের বাসভবন বিচার-বহির্ভূতভাবে ভেঙ্গে দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টকে চিঠি দিয়েছেন সে দেশের সাবেক বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। ভারতের প্রধান বিচারপতি এনভি রামানাকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠিতে তারা একইসঙ্গে বিক্ষোভকারীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার বন্ধ করতে স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের ১২ জন সাবেক বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। চিঠিতে বিচারক ও আইজীবীরা প্রধান বিচারপতিকে উত্তর প্রদেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধের আহ্বান জানিয়েছেন।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা সম্প্রতি মহানবী (স.) সম্পর্কে বিজেপি মুখপাত্রদের মন্তব্যকে ঘিরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ও বিশেষত উত্তর প্রদেশে বিক্ষোভের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন- ‘বিক্ষোভকারীদের মত প্রকাশের ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে উত্তর প্রদেশ রাজ্য সরকার প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস পদক্ষেপ নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে কর্মকর্তাদের এমন পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অংশ না নেয়।’
উত্তর প্রদেশ মুখ্যমন্ত্রীর এ মন্তব্য পুলিশকে নিষ্ঠুর হবার ও বিক্ষোভকারীদের বেআইনিভাবে নির্যাতনের সাহস জুগিয়েছে অভিযোগ করে চিঠিতে বলা হয়- ‘মুখ্যমন্ত্রীর আদেশ অনুযায়ী পুলিশ তিন শতাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে এবং প্রতিবাদে অংশ নেওয়া নাগরিকদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে।’
এতে বলা হয়- ‘সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পুলিশি হেফাজতে তরুণদের লাঠিপেটা করার, কোনো নোটিশ ও কারণ ছাড়াই বিক্ষোভকারীদের বাড়িঘর ভেঙ্গে দেওয়া, রাস্তাঘাটে মুসলিম তরুণদের পুলিশের ধাওয়া ও মারধর করতে দেখা যাচ্ছে, যা জাতির বিবেককে নাড়া দিচ্ছে।’
এ ধরনের নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন আইনের শাসনের ব্যত্যয় এবং সংবিধান ও মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি উপহাসের শামিল বলে সাবেক বিচারপতি ও আইনজীবীরা উল্লেখ করেছেন।
তারা বলেন- ‘পুলিশ ও নগর প্রশাসন যেভাবে সমন্বয় করে বিক্ষোভকারীদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে তাতে এটা স্পষ্ট যে বিচার-বহির্ভূত সামষ্টিক শাস্তি হিসেবে বাড়িঘর ভাঙা ও উচ্ছেদ করা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সম্পূর্ণ বেআইনি।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা বলেন- ‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগের দৃঢ়তার পরীক্ষা হয়। অতীতে বিভিন্ন ইস্যুতে স্বপ্রণোদিত আদেশ দিয়ে ভারতের বিচার বিভাগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। আমরা আশা করি একই চেতনায় প্রাণিত হয়ে সংবিধানের রক্ষাকর্তা হিসেবে মান্যবর সুপ্রিম কোর্ট উত্তর প্রদেশে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি রোধে, বিশেষত পুলিশ ও রাজ্য প্রশাসনের জবরদস্তিমূলক আচরণ বন্ধে এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন রোধে স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেবেন।’
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন- সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি বি. সুদর্শন রেড্ডি, বিচারপতি ভি. গোপাল গৌডা, বিচারপতি এ.কে. গাঙ্গুলী, দিল্লি হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এপি শাহ, মাদ্রাজ হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি কে চন্দ্রু, কর্নাটক হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ আনওয়ার, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট শান্তি ভূষণ, ইন্দিরা জয়সিং, চান্দার উদয় সিং, মাদ্রাজ হাইকোর্টের সিনিয়র এডভোকেট শ্রীরাম পানচু, সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট আনন্দ গ্রোভার।