ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনামলে কেন্দ্রীয় কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ ছিল বিরল ঘটনা। এর আগে ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির কারণে মাত্র একজন মন্ত্রী পদ ছাড়েন। তবে এবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে প্রশাসনিক পরিবর্তনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু হিসেবে দেখছেন দেশের তরুণরা। তাদের মতে, এটি ছাত্র আন্দোলনের শক্তি ও জনমতের প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আন্দোলনের পেছনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক সচেতনতার বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবাদে পরিবর্তনের বিশ্বাস
দিল্লির ২২ বছর বয়সী আন্দোলনকারী সখী বলেন, জীবনে প্রথমবার তার মনে হয়েছে যে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর সামাজিক মাধ্যমে সরকারের এক মন্ত্রীর পুরোনো বক্তব্য—‘আমাদের সরকারে পদত্যাগ বলে কিছু হয় না’—নিয়ে তৈরি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের কাছে সেটি প্রতীক হয়ে ওঠে যে সংগঠিত জনমত সরকারের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমেই আন্দোলনের বিস্তার
এই আন্দোলনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ডিজিটাল সংগঠন। ইনস্টাগ্রাম রিলস, মিম ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর মাধ্যমে দ্রুত হাজারো শিক্ষার্থীকে একত্রিত করা হয়। আন্দোলনের সময় পুলিশের লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হলে জনসমর্থন আরও বাড়তে থাকে।
নিট প্রশ্নফাঁস থেকে আন্দোলনের সূচনা
চলতি বছরের মে মাসে ভারতের মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ দেশজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও আন্দোলনের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন
প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পর ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ গড়ে ওঠে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—
- শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ
- শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার
- নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ
ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ পরে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়।
দমন-পীড়নের পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত
১৮ জুলাই শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুককে অনশনস্থল থেকে পুলিশ সরিয়ে নেওয়ার পর আন্দোলনে নতুন গতি আসে। ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে পদযাত্রায় পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও ছররা গুলি ব্যবহারের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আরও অনেক তরুণ আন্দোলনে যোগ দেন।
শুধু প্রশ্নফাঁস নয়, ক্ষোভের কারণ আরও বিস্তৃত
আন্দোলনকারীদের মতে, শুধু একটি পরীক্ষা নয়; বেসরকারিকরণ, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, চাকরির সংকট, প্রশ্নফাঁস এবং সামাজিক বৈষম্য মিলিয়ে তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আইনে স্নাতক সোমায়া কোর্দে বলেন, শিক্ষা যদি ভবিষ্যৎ গড়ার প্রধান পথ হয়, তবে সেই ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
বেকারত্বও বড় উদ্বেগ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেক তরুণ স্থায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায়ও তরুণদের কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের বিষয়টি উঠে এসেছে।
পুলিশের ভয় কাটিয়ে রাস্তায় তরুণরা
১৮ বছর বয়সী হর্ষবর্ধন কদমের একটি ভিডিও দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। ভিডিওতে এক পুলিশ সদস্য তাকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন বলে দেখা যায়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
হর্ষবর্ধনের ভাষায়, তার উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়, সেটি সবার সামনে তুলে ধরা।
আন্দোলনের পরবর্তী লক্ষ্য
আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মনে করছে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগই শেষ নয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে আরও বড় পরিসরে আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে সংগঠকদের আশঙ্কা, সামনে তাদের বিরুদ্ধে আরও মামলা, গ্রেপ্তার বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে বহু আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস
সব বাধা সত্ত্বেও আন্দোলনকারী তরুণদের বিশ্বাস, এই আন্দোলন তাদের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। তাদের মতে, পরিবর্তন একদিনে আসে না; কিন্তু মানুষ যখন নিজের কণ্ঠের শক্তি উপলব্ধি করে, তখন তাকে সহজে নীরব রাখা যায় না।
দিল্লির একটি দেয়ালে লেখা একটি গ্রাফিতি যেন সেই বার্তাই বহন করে—
“আমাদের হাতে চাকরি নেই। আজ এই লেখা মুছে দেবে, কাল আমরা আবার ফিরে আসব।”