বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ছিলেন একজন গৃহবধূ। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতাকর্মীরা নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েন। নানা ষড়যন্ত্রে দলটি সংকটে পড়ে। এই সময় দলকে রক্ষা করতে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি, স্বামীর মৃত্যুর সাত মাস পর, খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন।
তিনি প্রথমে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং শেষে দলের চেয়ারপারসন হন। তখন তার বয়স ছিল চল্লিশের কম। তার নেতৃত্বে বিএনপির নতুন পথচলা শুরু হয়।
রাজনীতিতে এসে খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে দৃঢ় ও সাহসী নেত্রী হিসেবে পরিচিত হন। নানা সংকটে তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার দশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। প্রায় ৪৩ বছর ছিল তার রাজনৈতিক জীবন। জীবনের শেষ দিকে তিনি জাতির ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে শেষ জীবনে এসে তিনি দল-মতনির্বিশেষে সবার কাছে সম্মানিত হন।
১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ১৯৮৩ সালে তিনি স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। তার নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭–দলীয় জোট। দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ পতনে তার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সময়েই তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৯০-এর গণ-আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন পেয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। পরে আরও দুইবার তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। মুসলিমপ্রধান একটি দেশে একজন নারীর এভাবে নেতৃত্বে ওঠা ছিল বিরল ঘটনা।
২০০৭ সালের এক-এগারোর পর সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। ওই সময় দুর্নীতির মামলায় তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো গ্রেফতার হন। একই দিনে খালেদা জিয়াকেও গ্রেফতার করা হয়। পরে তারেক রহমানকে লন্ডনে এবং কোকোকে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকাকালে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি রাজি হননি।
২০১০ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ১৩ নভেম্বর তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এরপর তিনি গুলশানের ভাড়া বাসা ‘ফিরোজা’য় ওঠেন। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান মারা যান। তখন তিনি গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পান। তবে দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও চিকিৎসার অভাবে তার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে।
হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়লে মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে ২৩ নভেম্বর তাকে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
৩১ই ডিসেম্বর বুধবার বিকাল ৩টা ৩ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষাধিক মানুষ জানাজায় অংশ নেন। পরে তাকে শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
জানাজা শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া শৈশব থেকেই পরিপাটি জীবন পছন্দ করতেন এবং ফুল ভালোবাসতেন। তার রাজনৈতিক বক্তব্যেও সৌন্দর্য ও দৃঢ়তা ফুটে উঠত।
তিনি আরও বলেন, ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছরই খালেদা জিয়া বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করেছেন। নয় বছরের আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি ১৯৯১ সালে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ খুলে দেন। দেশ ও মানুষের স্বার্থে তিনি কখনো আপস করেননি। তাই জাতির কাছে তিনি চিরকাল ‘আপসহীন দেশনেত্রী’ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।