ভারতে ২০২৭ সালে চিকিৎসা ব্যয় ১০ দশমিক ১ শতাংশ বাড়তে পারে। আগের বছরের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির হার কিছুটা কমলেও দেশটির সাধারণ মূল্যস্ফীতির তুলনায় তা দ্বিগুণেরও বেশি থাকবে। এতে হৃদ্রোগ, ক্যানসার, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। বৈশ্বিক পেশাদার সেবা প্রতিষ্ঠান এওনের (Aon) এক নতুন প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এওনের ‘২০২৭ গ্লোবাল মেডিক্যাল ট্রেন্ড রেটস রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির হার ছিল ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা কমে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে একই সময়ে দেশটির সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় চিকিৎসা ব্যয় অনেক দ্রুত বাড়বে।
প্রতিবেদনে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে হৃদ্রোগকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরপর রয়েছে কান, নাক ও গলার (ইএনটি) রোগ, ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতা এবং ক্যানসার। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও স্থূলতাকে ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির দ্বিগুণের বেশি বাড়বে চিকিৎসা ব্যয়
এওনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে ভারতে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৬ সালে এই হার ছিল ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ব্যয় বৃদ্ধির হার কমার অর্থ চিকিৎসা ব্যয় কমে যাওয়া নয়; বরং আগের বছরের তুলনায় কিছুটা ধীরগতিতে ব্যয় বাড়বে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর ২০২৭ সালে ভারতে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত হার দাঁড়াতে পারে ৬ দশমিক ১ শতাংশে। ২০২৬ সালে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
এওন ইন্ডিয়ার হেড অব হেলথ অ্যান্ড ওয়েলথ সলিউশনস অ্যাশলে ডি’সিলভা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যয় এখনো মূল্যস্ফীতির দ্বিগুণেরও বেশি হারে বাড়ছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার জন্য বরাদ্দ করা বাজেটের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে।
২০২৭ সালে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির গড় পূর্বাভাস ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ভারতের সম্ভাব্য হার এ আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে চীনে এ হার ৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।
চিকিৎসা ব্যয়ের বড় কারণ হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসার
ভারতের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, দীর্ঘমেয়াদি ও অসংক্রামক রোগের কারণে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে।
এওনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রধান কারণ হৃদ্রোগ। এরপর রয়েছে ইএনটি, ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং ক্যানসার। এসব রোগের চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ সেবন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, হাসপাতালে ভর্তি এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। ফলে রোগগুলোর চিকিৎসা ব্যয় স্বাস্থ্যসেবা খাতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে।
প্রতিবেদনের বৈশ্বিক বিশ্লেষণেও হৃদ্রোগকে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা ব্যয়ের দ্বিতীয় বড় কারণ ক্যানসার। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
স্থূলতা ও ডায়াবেটিস বাড়াচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি
প্রতিবেদনে উচ্চ রক্তচাপ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকে ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থূলতাকেও দীর্ঘমেয়াদি রোগের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এওনের বৈশ্বিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, দুই বছর আগে স্বাস্থ্যঝুঁকির তালিকায় স্থূলতার অবস্থান ছিল পঞ্চম। ২০২৭ সালের মূল্যায়নে তা উঠে এসেছে তৃতীয় অবস্থানে। স্থূলতার বিস্তারের সঙ্গে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে এসব রোগের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
এওনের গ্লোবাল বেনিফিটস বিভাগের ডেটা অ্যান্ড অ্যানালিটিকস লিডার ক্যাথরিন ডেভিস বলেন, হৃদ্রোগ, ক্যানসার ও উচ্চ রক্তচাপ এখনো চিকিৎসা ব্যয়ের প্রধান কারণ। তবে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের হার বাড়তে থাকায় আগামী বছরগুলোতে নিয়োগকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে আরও চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
চিকিৎসা ব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি করছে জিএলপি-১ ওষুধ
ডায়াবেটিস ও ওজন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্টসহ এ ধরনের ওষুধের ব্যবহার বৃদ্ধি চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি করছে।
এওনের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ দেশে এসব ওষুধ পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক দেশে নিয়োগকর্তাদের দেওয়া চিকিৎসা সুবিধার আওতায় ওষুধগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কোনো কোনো বাজারে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির হারের ১ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত এসব ওষুধের কারণে হতে পারে। গড়ে এ অবদান ৩ শতাংশের বেশি।
প্রতিবেদনে ডায়াবেটিসকেও চিকিৎসা ব্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৫৪টি বাজারের মধ্যে ডায়াবেটিসকে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির শীর্ষ পাঁচটি রোগের একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে ভারতে জিএলপি-১ ওষুধের কারণে চিকিৎসা ব্যয় কতটা বাড়তে পারে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে আলাদা কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।
চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব
চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মীদের সুস্থতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এওন। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্বব্যাপী জরিপে অংশ নেওয়া ৮৭ শতাংশ দেশ ২০২৭ সালে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে কর্মীদের সুস্থতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশ ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কর্মীদের পছন্দের সুযোগ বাড়াতে নমনীয় স্বাস্থ্যসুবিধা চালুর পরিকল্পনা করছে।
এওন ইন্ডিয়ার হেড অব হেলথ রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অরিজ রিজভি বলেন, ভারতের কর্মীবাহিনী বৈচিত্র্যময় এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। ফলে সবার জন্য একই ধরনের স্বাস্থ্যসুবিধা কার্যকর হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, নমনীয় সুবিধা এবং কর্মীদের সুস্থতায় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই স্বাস্থ্য কর্মসূচি গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও কর্মক্ষেত্রে সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা পরামর্শ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত কর্মীদের জন্য কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৭ সালে ভারতে চিকিৎসা ব্যয় ১০ দশমিক ১ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দেশটির স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে হৃদ্রোগ, ক্যানসার, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা চিকিৎসা ব্যয়ের বড় কারণ হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এওন।
সূত্র: এওন, এনডিটিভি।
