যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক মাসের সংঘাতের পর নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে ইরানে। দেশটির একাধিক রাজনীতিক, আইনপ্রণেতা ও প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা এখন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছেন। এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে এসে পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ শুরুরও দাবি উঠেছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ইয়াহু নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে নিউজম্যাক্সও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক মাসের যুদ্ধের পর ইরানের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহলে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। তাদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর আগে প্রতিপক্ষকে বড় ধরনের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে। ফলে দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন জরুরি।
ইরানের আইনপ্রণেতা আবুলফজল আবুতোরাবি সম্প্রতি দেশটিকে এনপিটি থেকে বেরিয়ে এসে পারমাণবিক বোমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন আরেক আইনপ্রণেতা মাহমুদ নাবাভিয়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যাপক মূল্য দেওয়ার পর এখন এনপিটি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের সময় এসেছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টেও বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা বাড়ছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি জানিয়েছেন, এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে পার্লামেন্টে ইতোমধ্যে ১০টি প্রস্তাব জমা পড়েছে।
পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের দাবিতে সরব হয়েছেন দেশটির প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতারাও। বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ জাভাদ হাজ আলী আকবরি এক জুমার খুতবায় ইরানের পারমাণবিক নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাতে তিনি এ দাবিকে ‘জাতীয় আকাঙ্ক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন পায়দারি ফ্রন্টও পার্লামেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সংগঠনটির দাবি, এনপিটির সদস্য থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা থেকে ইরান নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি। এ অবস্থায় চুক্তিতে থাকার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে সংগঠনটি। একইভাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিমও এনপিটিতে থাকার সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বরাবরই কঠোর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাকে তার সামরিক পদক্ষেপের অন্যতম প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, ইরানের হাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে দেওয়া যাবে না।
ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের পর ইরানের অভ্যন্তরে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকলে দেশটির দীর্ঘদিনের ঘোষিত পারমাণবিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক কূটনীতিতেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।
