রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় দায় নির্ধারণে আগামী ১৯ নভেম্বর রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আদালতে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় রায় পড়ার কথা রয়েছে। আইসিজের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি ইউজি ইওয়াসাওয়া এ রায় ঘোষণা করবেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার আদালত রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করে। মামলাটি আন্তর্জাতিক আইনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, গণহত্যার অভিযোগে একটি রাষ্ট্রের দায় সরাসরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ রায় গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মামলার রায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগে চলমান অন্যান্য মামলার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলাটিও রয়েছে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল মামলা
২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলাটি দায়ের করে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থনে করা এ মামলায় অভিযোগ আনা হয়, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর দেশটির সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে।
গাম্বিয়ার অভিযোগ, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে মিয়ানমার। তৎকালীন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে।
সেনা অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ওই অভিযানকে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বা নিরাপত্তা অভিযান হিসেবে বর্ণনা করলেও গাম্বিয়ার দাবি, এর উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করা।
গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার মিয়ানমারের
মিয়ানমার শুরু থেকেই গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির দাবি, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার জবাব দিতে সেনাবাহিনী ওই অভিযান পরিচালনা করেছিল।
২০১৭ সালের আগস্টে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় আরসার হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য নিহত হয়েছিলেন বলে দাবি করে মিয়ানমার। দেশটির বক্তব্য, সেনাবাহিনীর অভিযান ছিল সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ; রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
তবে গাম্বিয়ার অভিযোগ, হত্যাকাণ্ড, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং রোহিঙ্গাদের জন্ম প্রতিরোধের মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে মিয়ানমার।
উল্লেখ্য, আইসিজের এ মামলায় কোনো ব্যক্তির অপরাধের বিচার হচ্ছে না। এটি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার আইনি বিরোধ। অর্থাৎ গণহত্যা সনদের অধীনে রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমার দায়ী কি না, সেই সিদ্ধান্ত দেবে আদালত।
মামলার শুনানি ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি
২০১৮ সালে জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত মিশন জানায়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে ধারণা করার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মিয়ানমারের তৎকালীন বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে উপস্থিত হয়ে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এরপর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে অন্তর্বর্তী আদেশে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা এবং গণহত্যার অভিযোগ-সংক্রান্ত প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। ২০২২ সালের জুলাইয়ে মামলার বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে মিয়ানমারের আপত্তিও খারিজ করেন আদালত।
চলতি বছরের ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি মামলার মূল বিষয়ের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় রোহিঙ্গা সাক্ষীদের রুদ্ধদ্বার কক্ষে জবানবন্দি নেওয়া হয়। গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের বাইরে আরও ১১টি রাষ্ট্র এ মামলায় অংশ নেয়।
যৌন সহিংসতার ভয়াবহ অভিযোগ
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতা।
২০১৭ সালে জাতিসংঘের হয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা তদন্ত করেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী অ্যান্টোনিয়া মুলভি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী বিভিন্ন গ্রাম ঘিরে ফেলে গুলি চালাত, বাড়িঘরে আগুন দিত এবং নারী ও কিশোরীদের ধর্ষণ করত। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সামনেই এসব নির্যাতন চালানো হতো।
কোনো কোনো ঘটনায় একাধিক নারী ও কিশোরী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। মুলভির বর্ণনায়, নির্যাতনের শিকার এক অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারী আট মাসের গর্ভাবস্থায় একাধিক ব্যক্তির দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন।
গাম্বিয়ার আইনজীবীরা এসব ঘটনাকে গণহত্যার অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করেছেন। তাঁদের মতে, যৌন সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত নির্যাতন নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
মামলায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
এ মামলায় বাংলাদেশ সরাসরি বাদী না হলেও শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ওপর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরেছে বাংলাদেশ।
মামলাটি পরিচালনায় গাম্বিয়াকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক সহযোগিতাও করেছে ঢাকা। গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল দাওদা এ জালোর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ছাড়া কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো থেকে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য তথ্য-প্রমাণ গাম্বিয়ার আইনি দলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সহযোগিতা করেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মামলার মূল শুনানি চলাকালে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে বাংলাদেশ দূতাবাস গাম্বিয়ার আইনি দল, রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
রায়ের গুরুত্ব ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাশা
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এর আগে বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যার ঘটনায় সার্বিয়াকে গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে দায়ী করেছিলেন। তবে সরাসরি গণহত্যা সংঘটনের জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করেননি।
২০১৫ সালে ক্রোয়েশিয়ার করা মামলাতেও সার্বিয়ার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ফলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলার রায় আন্তর্জাতিক আইনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, আদালত মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য দায়ী ঘোষণা করবেন। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ, জমি ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া, নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পথ তৈরি হবে।
রোহিঙ্গাদের অন্যতম প্রধান দাবি মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া। দেশটির ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের আওতায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করার বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ।
তবে মিয়ানমার আদালতের রায় বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটিতে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ও চলমান সংঘাতের কারণে রায় বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
সব মিলিয়ে আগামী ১৯ নভেম্বরের রায় শুধু রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার দায়ে রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার পর রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ের দিকে।
