রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঈসমাইল হোসেন নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল। কাজ থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হন তিনি। তার সন্ধান এখনও মেলেনি। এদিকে বাবার ছবি বুকে বেঁধে শাহবাগ জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়েছে মেয়ে আনিসা ইসলাম ইনসি (১৭)। সে বলে, ‘গত ৫ বছর থেকে আমার একটি নতুন পরিচয় হয়েছে। আমি একজন গুম হওয়া বাবার সন্তান।’ আর ঈসমাইলের সন্ধান পেতে প্রত্যেকটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে সব শেষ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে ব্যর্থ হয়েছে পরিবার।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ‘গুম-খুন, ক্রসফায়ার, কারা নির্যাতন বন্ধ করো! মানবাধিকার লঙ্ঘন রুখে দাঁড়াও!’ আহ্বানে মানববন্ধন করেছে গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’। এই মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ইনসি এই কথা বলে। আগামীকাল রোববার (১০ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে আজ শনিবার সকালে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এই মানববন্ধন করার কথা ছিল। কিন্তু মানববন্ধনে দাঁড়ানোর ১০ মিনিট পরেই পুলিশের বাধার মুখে পড়েন সমাবেশের আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা। আয়োজকেরা বলছেন, পুলিশ তাদের শাহবাগে দাঁড়াতে দেয়নি। পরে বাধ্য হয়ে তারা জাতীয় প্রেসক্লাবে এ কর্মসূচি পালন করেন।
এ সময় ইনসি পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘এই যে আপনারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আমাদের সামনে পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারা কি আমাদের ভয় পাচ্ছেন? আপনারা লাঠি নিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, আপনারা কি আমাদের মারবেন? তাহলে আমার বাবার সঙ্গে আমাদেরও গুম করে দিতেন।’
ইনসির মতো বাবার খোঁজ না পেয়ে মানববন্ধনে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে সাদিকা সরকার সাফা। তার বাবা যখন নিখোঁজ হন, তখন সাফা বয়স ছিল মাত্র তিন মাস। প্রায় ১০ বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছে সাফার বাবা মো. সোহেল। তিনি রাজধানীর বংশাল থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর শাহবাগ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয়। তার পর থেকে আর খোঁজ মেলেনি।
সাদিকা বলে, ‘আমি বাবাকে কখনো দেখিনি, বাবা বলে ডাকতে পারিনি। আমার একটাই দাবি, আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন। আমি আর কিচ্ছু চাই না।’
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে গুমের শিকার বংশাল থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. পারভেজ হোসেনের স্ত্রী ফারহানা আক্তার বলেন, ‘আমরা কী অন্যায় করেছি যে আমার স্বামীকে গুম করা হয়েছে? আমার স্বামীর কী দোষ—আমি এটা জানতে চাই। প্রধানমন্ত্রী, আপনি আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিয়েন না। আপনার কাছে রেখে দেন। শুধু এটুকু বলেন, কেন আপনি আমার স্বামীকে গুম করেছেন। আর কিছু জানতে চাই না আপনার কাছে।’
গুম হওয়া গাড়ি চালক কাউসার হোসেনের মেয়ে লামিয়া আক্তার মীম কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মীম বলে, ‘আজ ১১ বছর হয়ে গেছে আমি আমার বাবাকে দেখি না। আমার বাবাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন। বাবার সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাত ধরে হাঁটতে চাই।’
বিভিন্ন মামলায় রাজনৈতিক নেতাদের ধরতে গিয়ে তাদের স্বজনদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। সম্প্রতি এমন কিছু ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরেন সংগঠনটির সমন্বয়কারী আফরোজা ইসলাম আঁখি। তিনি বলেন, ‘এখন যাদের গায়েবি মামলা দিয়ে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কারাগারে নির্যাতন করা হচ্ছে, যাদের না পেয়ে তাদের স্বজনদের, বাবাকে, ভাইকে, স্ত্রীকে সন্তানসহ কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—তাদের বিচারের দাবিতে, তাঁদের ফিরে পাওয়ার দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছি।’
এদিকে মানববন্ধনে অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট দানবীয় সরকার মানুষের বুকের রক্তের ওপর দিয়ে, মানুষের লাশের ওপর দিয়ে ক্ষমতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।’
এ সময় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যত অত্যাচারই করুক, মায়ের ডাক তারপরও তাদের লড়াই অব্যাহত রাখছে।’ ‘মায়ের ডাক’ একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। মায়ের ডাক শাহবাগে দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে তাদের ধাক্কা দিয়ে বিদায় করা হয়েছে। পুলিশসহ এই সরকারের যত বাহিনী আছে, যত অত্যাচারই করুক, মায়ের ডাক তাদের লড়াই অব্যাহত রেখেছে। এই লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। গত ১০ বছরে এই প্রেসক্লাবে কতবার দাঁড়িয়েছি, কতবার কথা বলেছি, মানবতার ডাক সরকারের কানে যায়নি। এখন মানুষের সব মানবিক অধিকার হরণ করে, গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার হরণ করে তামাশা করছে।’
সূত্র: তথ্য ও ছবি: চ্যালেন ২৪
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।