যেসব নিয়ম মানলেই সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত হবে নৌকা বাইচ রাশিম মোল্লাঃ সব নৌকা বাইচ আয়োজকরাই চায় বাইচ সুশৃঙ্খল ও সুন্দর ভাবে শেষ করতে। কিন্তু ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও অনেক সময় সুন্দর ভাবে শেষ করা যায় না। নৌকা বাইচ সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করতে তিন পক্ষকে সচেতন, সজাগ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়। আর সেই তিনটি পক্ষ হলেন – বাইচ আয়োজক কমিটি, দর্শক এবং নৌকার মালিক-মাঝি মাল্লা।
মূলত বাইচে এদের যে কোনো একটি পক্ষ ঘটিয়ে দিতে পারে বিপত্তি। এ কারণে নৌকা বাইচ আয়োজক কমিটিকে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। তারা নিজেরা বাইচ দেখতে মত্ত থাকলে ঘটে যেতে পারে বিপত্তি। একইসঙ্গে দর্শকদেরকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়। কোনো ভাবেই বাইচের টান শুরু হওয়ার পর নদীতে বোট চালানো বন্ধ রাখতে হবে। কেউ কারো সঙ্গে ঝগড়া বিবাদে জড়ানো যাবেনা। নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির গবেষণা প্রতিবেদন সেলের প্রধান রাশিম মোল্লা প্রিয় বাংলাকে বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলার নৌকা বাইচ আয়োজক, বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যাক্তিত্ব ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে এ প্রতিবেদন করা হয়েছে। বাইচ সুন্দর সুশৃঙ্খল করতে তারা নৌকার মালিক ও মাঝি-মাল্লাদের ১০টি নিয়ম মানার পরামর্শ দিয়েছেন।
১. নৌকা বাইচের কমপক্ষে ৭ দিন আগে রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে। রেজিষ্ট্রেশন বিহীন কোনো নৌকা অংশ নিতে পারবে না।
২. প্রতিটি নৌকার মালিক মাঝি মাল্লা নিয়ে সকাল ১২ টার মধ্যে স্টেজের সামনে নৌকার মালিককে উপস্থিত হতে হবে।
৩. বাইচের দিন ১ টায় লটারির মাধ্যমে নৌকার জোড়া নির্ধারণ করে বিভিন্ন টিমে বিভক্ত করা হবে। বাইচে এই কাজটা করতে অনেক সময় ব্যায় হয়। এজন্য বাইচ শুরুর আগেই এই কাজটি করতে হবে। সেজন্য প্রতিটি নৌকার মালিককে যথাসময়ে উপস্থিত থাকতে হবে।
৪. প্রতিটি নৌকাকে দুপুর ৩ টায় স্টাটিং পয়েন্টে থাকতে হবে।
৫. টান ছাড়ার সময় নির্ধারিত স্টাটিং পয়েন্টে নৌকার অগ্রভাগের মাল্লা বাঁশ ধরে রেডি হবেন। কেউ যদি এই নিয়মের ব্যাত্যয় ঘটান, তাহলে উক্ত নৌকা বাতিল করা হবে। এক্ষেত্রে কোনো নৌকার ওজর আপত্তি গ্রহণ করা হবে না। এই কাজটা করতেও অনেক সময় যায়। নৌকারবমাঝিরা সমান হতে চান না। যেসব মাঝি এই কাজ করবেন নৌকা মালিক সমিতির তার বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নিবেন।
৬. এক নৌকা আরেক নৌকার সঙ্গে চাপানো যাবে না। যার যার সাইডে থাকতে হবে। যে নৌকা চাপিয়ে দিবে এবং এজন্য যে নৌকা দায়ী থাকবে তাকে বাতিল করা হবে।
৭. এক নৌকার মাঝি মাল্লা আরেক নৌকার মাঝি মাল্লার সঙ্গে ঝগড়াঝাটি কিংবা মারামারি করতে পারবে না। যদি কেউ মারামারি করেন তাহলে ওই দায়ী নৌকার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাবস্থা নিতে বাধ্য হবে।
৮. প্রথম টানে যিনি জয়ী হবেন। বাইচ কমিটির কাছ থেকে জয়ী স্লিপ নিয়ে দ্রুত দ্বিতীয় টানের জন্য স্টারটিং পয়েন্টে যেতে হবে।
৯. টান ছাড়ার পর নৌকার পিছনে পিছনে কোনো নৌকা মালিকের বোট যেতে পারবে না। শুধু মাত্র কমিটির একটি বোট পিছনে থাকবে।
১০. কোনো বিষয়ে অভিযোগ থাকলে নৌকার মালিককে কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
নৌকা বাইচ আয়োজকদের ৯টি করনীয়ঃ
১. নৌকা বাইচ আয়োজনের ১৫ দিন আগে নৌকার মালিকদের চিঠি দিয়ে বাইচে অংশ গ্রহণ করার আহ্বান জানাতে হবে।
২. নৌকার মালিকদেরকে ৭ দিনের মধ্যে রেজিস্টেশন সম্পন্ন করবেন।
৩. ফুটবল খেলায় রেফারি, ক্রিকেট খেলায় আমপেয়ার যেমন লাগে তেমনি নৌকা বাইচ পরিচালনা করতে দক্ষ নৌকা বাইচ পরিচালক লাগে। কমপক্ষে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি বাইচ পরিচালক টিম লাগবে। আয়োজকদের সঙ্গ বাইচ পরিচালনা কমিটির ২ জন স্টাটিং পয়েন্টে, ২ জন ফিনিশিং পয়েন্টে, ১ জন স্টেজে, ২ জন নৌকার পিছনে কমিটির ট্রলারে থাকবে।
৪. নৌকার টান ছাড়ার সময় প্রতিটি নৌকায় ১জন করে কমিটির লোক দিতে হবে।
৫. নৌকা বাইচ শুরুর আগেই স্টার্টিং পয়েন্টে ট্রলারের ডান পাশে ১ টি বাঁশ ও বাম পাশে ১ টি বাঁশ গাড়তে হবে। বাইচ শুরুর সময় প্রতিটি নৌকার অগ্রভাগের মাঝি বাঁশ ধরবে। এরপর বাইচ পরিচালক ( রেফারি) বাঁশি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে টান শুরু হবে। যে নৌকা বাঁশ ধরবে না কিংবা সমান হবে না, উক্ত নৌকা বাতিল বলে গন্য করবেন বাইচ পরিচালক।
৬. টান ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমিটির ১ টি কিংবা দুটি বোট নৌকার পিছনে পিছনে যাবে। এ সময় মালিক কিংবা দর্শকের বোট থাকবে না। কমিটির ভোট নৌকা দুটি পর্যবেক্ষণ করবেন, দেখবেন কোনো নৌকা চাপিয়ে দেয় কিনা চাপিয়ে দিলে বাশি দিবেন এবং হ্যান্ড মাইকে দূরত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানাবেন। সামনে পিছনে কোনো বোট থাকলে তসদেরকে নিবৃত করবেন।
৭. ফিনিশিং পয়েন্টে ট্রলারে থাকা বাইচ পরিচালক( রেফারি) জয়ী নৌকা নির্ধারণ করবেন। ট্রলারে থাকা অন্যরা পর্যবেক্ষণ করবেন।
৮. নৌকা বাইচ পরিচালক(রেফারি) ফোনে স্টেজে থাকা নৌকা বাইচ পরিচালক( রেফারি)কে জয়ী নৌকার নাম বলে দিবেন।
৯. স্টেজে থাকা নৌকা বাইচ পরিচালক ( রেফারি) জয়ী নৌকাকে জয়ী ফ্লাগ দিবেন। জয়ী নৌকা ফ্লাগ নিয়ে দ্রতু পুনরায় স্টারটিং পয়েন্ট ২য় টানের জন্য যাবেন।
রাশিম মোল্লা
প্রধান, গবেষণা প্রতিবেদন উপকমিটি
সাধারণ সম্পাদক, নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা
জাতীয় কমিটি
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।