চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর রাতে নোয়াখালীর উপকূলী উপজেলা, হাতিয়া, কোম্পানীগঞ্জ, সুবর্ণচরে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সৃষ্ট প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও ভারি বৃষ্টিতে তিনটি উপকূলীয়এলাকা ছাড়াও সদর ও কবিরহাটসহ জেলার প্রতিটি উপজেলা ব্যপক ক্ষতি হয়। প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসে কাঁচাগাছ-পালা ঘর-বাড়িসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসলী জমি। কিন্তু ঝড়ের প্রায় তিন সপ্তাহ পরেও কৃষি অধিদপ্তর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কোনো তালিকা করা হয়নি বা সহযোগিতা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঘূর্ণিঝড়ের সময় ভারি বর্ষণের কারণে জেলার প্রায় ১০হাজার হেক্টর ফসলী জমিতে পানি ঢুকে পড়ে, যার মধ্যে একবারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমি। এরমধ্যে রোপা আমন ৭৯৮ হেক্টর, ৪০৫ হেক্টর শীতকালীন শাকসবজি ও শরৎকালীন সবজি ৩২ হেক্টর। দীর্ঘসময় ধরে জমিতে পানি জমে থাকায় শীতকালীন সবজির ক্ষতি হয়েছে। প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসে নুয়ে পড়েছিল আমন ধান। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জেলার কোম্পানীগঞ্জ ও হাতিয়া উপজেলায়। দুই জেলায় ফসলী জমির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ হেক্টর, এরমধ্যে কোম্পানীগঞ্জে ২০০ ও হাতিয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৯০০ হেক্টর জমি।
কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, ‘ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ধানগুলো এখনও নুয়ে পড়ে আছে, যেটুকু ফলন পাওয়া যায় তার আশায় কৃষকরা। ক্ষতিগ্রস্ত কিছু সবজির ক্ষেতে নতুন করে বীজ বপন করছেন কৃষকরা, তবে পুঁজি সংকটে বেশিরভাগ কৃষক নতুন করে চাষ করতে পারছেন না। ঝড়ের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পেরে দিশেহারা অনেক কৃষক।’
সুবর্ণচরের একাধিক কৃষক বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের আগে লাল শাক, মুলার শাকসহ বিভিন্ন প্রকার শীতকালীন সবজির বীজ লাগানো হয়। ঝড়ের মাত্র কয়েকদিন আগে সেগুলোতে ফলন আসতে শুরু করে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে সবজি ক্ষেতগুলোতে পানি জমে যায়। ২-৩ দিন ধরে জমিতে পানি থাকার পর পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে সবজিগুলো। এরপর হাতেগোণা কয়েকজন কৃষক যাদের কাছে বীজ ছিল তারা নতুন করে জমিতে আবার আবাদ করেছেন। বীজ বা নিজেদের কোনো পুঁজি না থাকায় বেশির ভাগ কৃষকের জমিই অনাবাদি পড়ে আছে।’
মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের কৃষক লিটন দাস বলেন, ‘চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহের দিকে রোপা আমন ধান ঘরে উঠানোর কথা ছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তার এক একর জমির বেশিরভাগ ধান নুয়ে পড়ায় ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। যেটুকু ফলন পাওয়া যাবে তাতে করে বীজ ও কীটনাশকের খরচও উঠবে না।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, কৃষি অফিস থেকে এখনও কোনো সহযোগিতা তারা পাননি।
হাতিয়ার হরনি ইউনিয়নের আমেনা বেগম বলেন, ‘বাড়ির সামনের আধা একর জমিতে তিনি শীতকালীন সবজি চাষ করেছিলেন। ঘূর্ণিঝড়ের সময় জোয়ারের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ায় সব সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। টাকা না থাকায় বর্তমানে জমিটি খালি পড়ে আছে। সরকারিভাবে আমাদের সবজির বীজ দিলে আবার জমিতে চাষ করতে পারতাম।’
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের ক্ষেত পরিদর্শন বা তাদের ক্ষতির কোনো তালিকা ও তাদের কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। তাদের দাবি দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের ক্ষতির তালিকা করে সরকারিভাবে সহযোগিতা করার। প্রতিটি প্রাকৃতিক দূর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে কৃষকরা। কৃষির বিপ্লব ধরে রাখতে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে তাদের প্রণোদনার আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শহীদুল হক বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে সূর্যমুখী, সরিষা, বাদাম, ভুট্টা, খেসারির ডালসহ ৩৫ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য বরাদ্দ আমাদের হাতে এসেছে। উপজেলাভিত্তিক তা হস্তান্তর করা হয়েছে, তালিকা করার পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ১বিঘা করে জমির ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে আরও বরাদ্দ আসবে। সময়মতো প্রণোদনার টাকা কৃষকদের দেওয়া হবে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।