গত বছরের মার্চ মাসে ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার হওয়া আলেমরা পবিত্র রমজানেও কারাগারে আছেন। অথচ, বিভিন্ন অপরাধীরা জামিনে বের হওয়ার খবর পাওয়া যায় নিয়মিত। চিত্রনায়িকা পরিমনিকে মাদক মামলায় গ্রেফারের পরই জামিন দেওয়া হয়েছিল। ক্যাসিনো সম্রাট হিসাবে পরিচিত যুবলীগ নেতা সম্রাটের দুই মামলায় রোববার (১০ এপ্রিল) ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে জামিন মঞ্জুর হয়েছে। অথচ, আালেমদের জামিন মিলে না বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও। দেশের খ্যাতানামা এত আলেম এক সঙ্গে অতীতে কখোন কারাগারে থাকার নজিরও নেই। আটক থাকা আলেমদের মুক্তির জন্য রাজপথেও কোন আওয়াজ নেই। তাদের কথা হয়ত ইতোমধ্যে অনেকে ভুলেই গেছেন!
কারাগারে আটক আলেমদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন কোন সংগঠনের সাথে সরাসরি জড়িত নয়, শুধু ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য রাখতেন। জনপ্রিয়তার ভয়ে তাদেরকেও বিনা অপরাধে আটক করে জেলে রাখা হয়েছে।
কারাগারে আটক আলেমদের অনেকের ক্ষেত্রে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে চরম নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। এই আলেমদের প্রত্যেকেই মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের খতিব এবং রমজানে তারাবির নামাজের ইমাম। পবিত্র রমজানে তাদের অনেকেই ধর্মীয় নানা আয়োজনেও ব্যস্ত থাকতেন।
কারাগারে থাকা আলেমদের মধ্যে রয়েছেন, মুফতি ইজাহারুল হক, মুফতি কাজী ইব্রাহীম, মুফতি হারুন ইজহার, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়েজী, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজি, মুফতি আমির হামজা, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলনা মনির কাসেমী, মুফতি আমির হামজা, মাওলানা নাসির উদ্দিন মনির, মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী, মাওলানা মাহমুদ গুনবী, মাওলানা ফখরুল ইসলাম, মাওলানা আসাদুল্লাহ, মাওলানা এহসানুল হক, মাওলানা আতাউল্লাহ আমিনসহ অনেকে। এই আলেমদের মধ্যে মুফতি কাজী ইব্রাহীম, মুফতি আমির হামজা এবং রফিকুল ইসলাম মাদানী ওয়াজ মাহফিলের বক্তা হিসাবে সুপরিচিত।
রমজানের আগে হেফাজতে ইসলামের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে স্বাধীনতার পর একসঙ্গে এত আলেম কারাগারে থাকার নজির নেই। হেফাজতে ইসলামের বিবৃতির এই দাবী প্রমাণ করে, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদি শাসনে আলেমদের গ্রেফতারে নতুন নজির তৈরি করেছে।
২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষ্যে ভারতের হিন্দুত্ববাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক হিসাবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ঢাকায় আমন্ত্রণের প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল আলেমদের পক্ষ থেকে। নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় আসার প্রতিবাদে ২৬ মার্চ (২০২১) শুক্রবার বিক্ষোভে মিছিলে পুলিশ ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে ৪জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১জন মাদ্রাসা ছাত্র নিহত হন। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশের নির্বিচারে গুলি ও মাদ্রাসা ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে পরের দিন শনিবার বিক্ষোভ এবং রবিবার হরতাল ঘোষণা করেছিল হেফাজতে ইসলাম। এই হরতালের দিনেও পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের যৌথ আক্রমনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৮জন নিহত হন। এছাড়া গুরুতর আহতদের ৫জন ২৯ মার্চ, ১ জন ৩০ মার্চ নিহত হন। সব মিলিয়ে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের যৌথ আক্রমনে নিহত হয়েছিলেন ১৬ জন।
অথচ, সরকার এসব হত্যাকাণ্ডের কোন প্রতিকার না করে উল্টো আলেমদের পাইকারিহারে গ্রেফতার শুরু করে। অনেক কওমি মাদ্রাসার ছাত্র তখন গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাদের অনেকেই এখনো কারাগারে আছেন বলে জানা গেছে।
এই ঘটনার পর ১৭ এপ্রিল (২০২১) গ্রেফতার করা হয় ঢাকা মহানগর হেফাজতে ইসলামের আমির মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে। তিনি ইসলামী বক্তা এবং একটি মাদ্রাসায় হাদিসের শিক্ষক ছিলেন। নানা নাটকীয়তার পর ১৮ এপ্রিল গ্রেফতার করা হয় হেফাজত নেতা আল্লামা মামুনুল হককে। ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্যের মাধ্যমে মামুনুল হক এবং জুনায়েদ আল হাবিব দুইজনেই তখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তাদের ধারাবাহিকতায় একে একে হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে মুখ্য ভুমিকা রেখেছেন এমন আলেমদের খুঁজে খুঁজে গ্রেফতার করা শুরু হয়।
কারাগারে থাকা কয়েকজন আলেমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারের পর বিভিন্ন বানোয়াট মামলায় রিমান্ডে নিয়ে তাদের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম নির্যাতন। একজন আলেমের পারিবারিক সূত্র জানান, গ্রেফতারের পর প্রথম ৩ মাসে ৫০ দিন রিমান্ডে রাখা হয়েছিল তাঁকে। ২৫টি মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। রিমান্ডে প্লাস দিয়ে তাদের হাত ও পায়ের নখ উঠানো হয়েছে। দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যাণ্ডকাপ লাগিয়ে টানা ৬ দিন দাড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। লাঠি দিয়ে প্রহার করা হয়েছে। নির্যাতনের এমন কোন কৌশল বাকী নেই তাদের উপর প্রয়োগ করা হয়নি। পুলিশের তৈরি করে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী স্বীকারোক্তির জন্য তাদের চাপ সৃষ্টি করা হয় রিমান্ডে।
আলেমদের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে কারাগারে আটক রাখার পরও তাদের জন্য রাজপথে তেমন কোন আওয়াজ নেই। অথচ, এই আলেমরা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবীতেই আন্দোলন কর্মসূচি সংগঠিত করার কারণে কারাগারে আটক রয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।