১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের চেতনা, জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন ও খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার প্রত্যাশা
বিশেষ নিবন্ধ
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
২০২৬ সালের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বিএনপির জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবারই প্রথম দিবসটি পালন করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্বাধীনতাযুদ্ধের পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে বাবা শহীদ জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রভাব রয়েছে। জিয়াউর রহমানের দেশ গঠনের চিন্তা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ যেমন বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করেছে, তেমনি খালেদা জিয়ার দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
অন্যদিকে, তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং কারাবাসের অভিজ্ঞতাও তাঁর রাজনৈতিক পথচলার অংশ। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর সামনে এখন রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
২০২৬ সালের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন বক্তব্য, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা ও সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কা, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সরকারকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে বড় প্রশ্ন হলো, তিনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবেন এবং অর্থনৈতিক চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে পারবেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু দলীয় শক্তি নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা, বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধা, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
লেখকের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় পরিচয়, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, মুক্ত অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস।
জিয়াউর রহমানের ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচিতে জাতীয় ঐক্য, উৎপাদন বৃদ্ধি, স্বনির্ভরতা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল। লেখকের মতে, আধুনিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণে এসব ধারণার প্রভাব রয়েছে।
তিনি আরও মনে করেন, রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিবিদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো রাষ্ট্রের স্বার্থকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন মূল্যায়নে এ বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে সংগঠিত রাখার প্রচেষ্টা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
লেখকের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব, রাজনৈতিক চাপ ও নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও তিনি গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও বহুমতের সহাবস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বিএনপির ২০৩০ রূপকল্পেও রাষ্ট্র পরিচালনা, সুশাসন ও উন্নয়নের বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছিল।
লেখকের দৃষ্টিতে তারেক রহমানের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল রয়েছে।
প্রথমত, শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি। দ্বিতীয়ত, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০। তৃতীয়ত, তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব।
এই তিনটি কর্মসূচির মূল বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জাতীয় ঐক্য, সুশাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন লেখক।
বিশেষ করে ৩১ দফায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, জবাবদিহি, নির্বাচনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই সময় সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সিপাহি-জনতার অংশগ্রহণ নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
লেখকের মতে, ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য শুধু সেনানিবাসের অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। বরং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সম্মিলিত প্রেক্ষাপটে দিনটিকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন—প্রতিটি ঘটনাই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে।
তবে এসব ঘটনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য প্রামাণ্য দলিল, গবেষণা ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করেন লেখক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সংবিধান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তিরও রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহিংসতা, নাশকতা এবং আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
সরকারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হলো বিরোধী মতকে সম্মান করা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরিহার করা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
পবিত্র কোরআনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিষয়ে পরামর্শের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামি চিন্তাবিদ ইমাম কুরতুবির ব্যাখ্যাতেও জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনব্যবস্থায় পরামর্শ, মতবিনিময় ও ন্যায়বিচারের চর্চা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত।
লেখকের মতে, বর্তমান সরকারের জন্যও রাজনৈতিক ঐকমত্য, অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ এবং জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা প্রয়োজন।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মূল তাৎপর্য নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে একটি অভিন্ন অবস্থান প্রয়োজন।
শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ এবং তারেক রহমানের ৩১ দফার ঘোষিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি অর্জিত হয়, সেটিই হবে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাই প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার বড় দায়িত্ব রয়েছে। জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারলেই ৭ নভেম্বরের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় জীবনে অর্থবহ করে তোলা সম্ভব।
লেখক: উইকলি ইকোনমিক টাইমস সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।