আজ ৭ নভেম্বর, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর ঐতিহাসিক এই দিবসটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংকট এবং রাষ্ট্রীয় অনিশ্চয়তার মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যদের একটি অংশ ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অভ্যুত্থান ঘটে। এদিন বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনীতিতে তাঁর নেতৃত্বের উত্থানের পথ তৈরি হয়।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে ৭ নভেম্বর জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রেরণার দিন হিসেবে বিবেচিত। দলটির নেতাকর্মীদের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও দিবসটি পালনে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সাল ছিল চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার বছর। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে একের পর এক সংকট তৈরি হয়।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হয়। পরবর্তী সময়ে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
এরপর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে শুরু হয় নানা টানাপোড়েন।
এর ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটে। এ সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে একের পর এক ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এ পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর ভোরে সেনানিবাসে সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। সৈনিকদের একটি অংশ জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। পরে সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৈনিক ও জনতার মধ্যে সংহতির দৃশ্য দেখা যায়।
ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহে জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকা এবং সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান নিয়ে ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। একই ঘটনায় খালেদ মোশাররফ ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী নিহত হন।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের উত্থান ঘটে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন।
১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে দলটির রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও উন্নয়নের রাজনীতিকে সামনে নিয়ে আসে দলটি।
তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
খাল খনন কর্মসূচি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিএনপির মতে, জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করা এবং অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। তাঁরা জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে ৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে ১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে ৭ নভেম্বরকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি গণতান্ত্রিক, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাম্য ও ন্যায্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশের বাংলাদেশ মিশনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে ১০ টাকা মূল্যমানের স্মারক ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম এবং পাঁচ টাকা মূল্যমানের ডেটা কার্ড অবমুক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ৫ থেকে ১১ নভেম্বর সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হওয়ার কথা রয়েছে। এতে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, এতিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায়ও শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার কর্মসূচি রয়েছে।
বিএনপির নেতারা ৭ নভেম্বরকে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে উল্লেখ করে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরছেন।
বিএনপির পাশাপাশি সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও দিবসটি উপলক্ষে পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। লেবার পার্টিও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা করবে।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালনের মধ্য দিয়ে ৭ নভেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের স্মরণ শুরু হয়েছে। জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের চেতনা ধারণের প্রত্যাশায় আজ দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দিবসটি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।