সরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতির কারণে দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় সমর্থন দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইসরাইলের বিরোধী নেতারা। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়কে তারা এই পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠন করা গেলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এই ফলাফলকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযান নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইসরাইলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও ফলাফলে এগিয়ে রয়েছে। ফলে তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের পক্ষে সরকার গঠন করে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো সহজ হচ্ছে না।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বুধবার ও বৃহস্পতিবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নেতানিয়াহু।
দশকের পর দশক ধরে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের প্রেসিডেন্টের আমলেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে প্রতি বছর ইসরাইলকে শত শত কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।
অতীতে ইসরাইলের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলেও নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই রিপাবলিকানদের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরু হলে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি রিপাবলিকানদের একটি অংশের মধ্যেও ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমতে থাকে। চলতি বছর ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর যৌথ নির্দেশে ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর এই অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
এবারের নির্বাচনি প্রচারণায় কয়েকজন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ইসরাইলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তার সমালোচনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এমনকি নির্বাচনের দিন মঙ্গলবার ট্রাম্প ইসরাইলকে দেওয়া বার্ষিক ৪০০ কোটি ডলারের অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণা দেন। তার দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটদের একটি ‘খারাপ রাজনৈতিক হাতিয়ার’ কেড়ে নেওয়া হবে। তবে এতদিন তিনি নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন দিয়ে এসেছেন।
এদিকে বুধবার ইসরাইলের বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট বলেছেন, তার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমরা এই অংশীদারত্বকে নতুন ও গভীর করব। বহু বছর ধরে যে দ্বিদলীয় ভিত্তির ওপর এই সম্পর্ক টিকে ছিল, তা আরও শক্তিশালী করব এবং সামগ্রিকভাবে পশ্চিম এশিয়ার উন্নয়নে কাজ করব।’
ইসরাইলের মধ্য-বামপন্থী বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটসের প্রধান ইয়ার গোলানও মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলকে নেতানিয়াহুর জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের কাছেই নেতানিয়াহু কতটা ক্ষতিকর হয়ে উঠেছেন, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল তা প্রকাশ করেছে।
মধ্যপন্থী বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা ইসরাইলের জন্য আর গ্রহণযোগ্য নয়।
তার ভাষ্য, ‘নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা আমাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে, গণতন্ত্রকে বিপন্ন করছে এবং বৈশ্বিক মঞ্চে আমাদের অবস্থান ধ্বংস করে দেবে।’
তবে মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেননি নেতানিয়াহু। তার দপ্তর থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু নাকি আইজেনকোটের হাতে যাবে, তা স্পষ্ট হতে কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
ইসরাইলে সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ পাওয়া প্রার্থীকে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন করতে হবে। তিনি ব্যর্থ হলে অন্য প্রার্থীকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে। দুজনের কেউই সফল না হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
এদিকে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উডি সোমার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নতুন মার্কিন কংগ্রেস ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে বৈরী কংগ্রেসে পরিণত হতে পারে।
তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতির অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে থাকলেও কংগ্রেসের শুনানি, নজরদারি এবং বাজেটসংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন।
সোমারের ভাষায়, ‘ডেমোক্র্যাটদের এই বিশাল জয় এবং রিপাবলিকানদের এই ভরাডুবি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়েরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ইসরাইলের সরকার গঠন প্রক্রিয়া—এই দুই বিষয়ই আগামী দিনে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।