জনগণের চাহিদা ও সময়ের প্রয়োজনে সংবিধানে পরিবর্তন বা সংশোধন আনা যেতে পারে। তবে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানকে কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন বা খাটো করার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেন।
তিনি অভিযোগ করেন, একটি ‘অশুভ শক্তি’ সংবিধানকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি করে জাতিকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে গণফোরাম আয়োজিত ‘সংবিধান দিবস’ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির লিখিত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ড. কামাল হোসেনের পক্ষে বক্তব্যটি পাঠ করেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান।
সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন তাঁর বক্তব্যে বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধান নির্ধারিত মৌলিক নীতিমালা এবং জনগণের সাংবিধানিক অধিকার কোনো অবস্থাতেই কেড়ে নেওয়া যাবে না। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধান এ দেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ।
তিনি বলেন, শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদে সেই আদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মাদকের বিস্তার রোধ এবং সন্ত্রাস দূর করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি লাখ লাখ বেকার তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় দেশ মারাত্মক বিশৃঙ্খলার মুখে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, একটি স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘তারা সব সংসদীয় কমিটিতে যোগ দিচ্ছে, বৈঠকে অংশ নিচ্ছে এবং সদস্য হিসেবে নাম দিচ্ছে। তবে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যাবে না—এটা কেমন অবস্থান? তারা যেখানে ৩৪টি সংসদীয় কমিটিতে নাম দিয়েছে, সেখানে কেন শুধু সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেয়নি? এর পেছনে মূল কারণ কী?’
বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদীয় আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া তাদের দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সংস্কারের যে প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা ও উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তার মৌলিক লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমরা বলতে পারি যে মৌলিক সংস্কারগুলো এখন পর্যন্ত কার্যকর করা যায়নি। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ যেমন সম্ভব হয়নি, তেমনি সংস্কারের যে দাবি আমরা তুলেছিলাম, শেষ পর্যন্ত তার কোনো বাস্তবায়নই ঘটেনি।’
সভায় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, সংবিধানের যেকোনো সংশোধন হতে হবে ১৯৭২ সালের সংবিধানের কাঠামোর ভিত্তিতে।
অন্যদিকে, ১৯৭২ সালের সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যাপক আবদুর রউফ মূল সংবিধান বাতিলের যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার আনতে হলে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন। পাশাপাশি মতৈক্য কমিশনে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত বিষয়গুলো দ্রুত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গণফোরাম সভাপতি সুব্রত চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, আইনজীবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।