সিআই কার্ডধারী মার্কিন নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন আদালতের | লিখিত মুচলেকা ও নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন অভিনেতা
সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে মুম্বাই হাইকোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়েছেন বলিউড অভিনেতা ইমরান খান। ভারতের নাগরিক নন, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ডধারী—এই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে আদালত বলেছেন, ভারতীয় নাগরিকদের মতো রাজনৈতিক প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার অধিকার তাঁর নেই।
সোমবার (তারিখ উল্লেখ করা হয়নি) প্রধান বিচারপতি এমসি ত্রিপাঠি ও বিচারপতি অদ্বৈত শেঠনার সমন্বয়ে গঠিত মুম্বাই হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি হয়। শুনানিতে আদালত বলেন, কোনো ভারতীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে একই ধরনের বিক্ষোভে অংশ নিলে তাঁকেও পরবর্তী ফ্লাইটে ভারতে ফেরত পাঠানো হতে পারত।
আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণের পর ভারতে অবস্থানের বিষয়ে লিখিত মুচলেকা দিতে সম্মত হয়েছেন ইমরান খান। পাশাপাশি তাঁকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হয়েছে। তবে তাঁর ভারতে থাকা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী ৭ ডিসেম্বর নেওয়া হবে। এর আগে দেশত্যাগের নির্দেশের ওপর দেওয়া অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের মেয়াদও ওই দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার
জনপ্রিয় অভিনেতা আমির খানের ভাগনে ইমরান খান গত ১০ অক্টোবর মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত জ্ঞানেশ কুমারবিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেন। এ ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) তাঁকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ পাঠায়। ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে মুম্বাই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অভিনেতা।
আবেদনে ইমরানের যুক্তি ছিল, জন্মসূত্রে তিনি মার্কিন নাগরিক হলেও জীবনের প্রায় পুরো সময়ই ভারতে কাটিয়েছেন। তাঁর বেড়ে ওঠা, বসবাস ও কর্মজীবনের বড় অংশ এই দেশকে ঘিরেই। ওসিআই কার্ডধারী হিসেবে ভারতে বসবাসের বিষয়টিও তিনি আদালতের সামনে তুলে ধরেন।
আদালতের প্রশ্ন, কেন নিচ্ছেন না ভারতীয় নাগরিকত্ব
সোমবারের শুনানিতে আদালত ইমরানকে মনে করিয়ে দেন, দীর্ঘদিন ভারতে বসবাস করলেও তাঁর নাগরিকত্বের পরিচয় বদলায়নি। তিনি একজন মার্কিন নাগরিক এবং ওসিআই কার্ডধারী। ফলে ভারতীয় নাগরিকদের মতো সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার দাবি করতে পারেন না।
বিচারপতিরা বলেন, ভারতের ভোটার তালিকা কিংবা ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো বিষয়ে তাঁর অংশগ্রহণের অধিকার নেই। কারণ, তিনি ভারতের ভোটার নন। একইভাবে রাজনৈতিক প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর নাগরিকত্বের অবস্থান বিবেচনায় নিতে হবে।
ইমরানের আইনজীবী ভেঙ্কটেশ ধোন্ড আদালতকে জানান, অভিনেতা জীবনের অধিকাংশ সময় ভারতে কাটিয়েছেন এবং এখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা ও পরিচিতি। জবাবে বিচারপতিরা বলেন, এসব বাস্তবতা সত্ত্বেও তাঁকে মেনে নিতে হবে যে তিনি ভারতের নাগরিক নন।
এ সময় আদালত প্রশ্ন তোলেন, কয়েক দশক ধরে ভারতে বসবাস এবং এখানকার চলচ্চিত্রজগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও তিনি কেন ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি।
ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি
শুনানিতে ইমরানের আইনজীবী দাবি করেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা নেতার সঙ্গে অভিনেতার যোগসাজশ ছিল না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাউকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।
আইনজীবী আরও জানান, ভবিষ্যতে ইমরান এ ধরনের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না। এ বিষয়ে আদালতে লিখিত প্রতিশ্রুতি বা মুচলেকা দিতেও তিনি প্রস্তুত।
অন্যদিকে, এফআরআরওর পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অনিল সিং অভিনেতার এসব যুক্তির বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি, ইমরান এর আগেও এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে পোস্ট দেওয়ার পাশাপাশি সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিপুলসংখ্যক অনুসারী থাকায় তাঁর বক্তব্যের প্রভাব অনেক মানুষের ওপর পড়তে পারে।
অনিল সিংয়ের বক্তব্য, শুধু ক্ষমা চাইলেই বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জনপ্রিয় তারকা হিসেবে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিল আদালত
শুনানিতে আদালত ইমরানকে তাঁর জনপ্রিয়তার বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন। বিচারপতিরা বলেন, একজন জনপ্রিয় তারকা হিসেবে তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ইমরান একজন বিদেশি নাগরিক ও ওসিআই কার্ডধারী। মহারাষ্ট্র ও ভারত তাঁকে পরিচিতি ও কর্মজীবনের সুযোগ দিয়েছে। তবে বিদেশি নাগরিকদের বহিষ্কারের অধিকারও রাষ্ট্রের রয়েছে।
এফআরআরওর ক্ষমতা প্রসঙ্গে আদালত বলেন, বিদেশি নাগরিকদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সার্বভৌম ক্ষমতা রয়েছে এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার নিয়েও আদালতের কোনো প্রশ্ন নেই।
তবে একই সঙ্গে ভারত যে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’—অর্থাৎ বিশ্বকে এক পরিবার হিসেবে দেখার নীতিতে বিশ্বাস করে, সে কথাও উল্লেখ করেন বিচারপতিরা।
৭ ডিসেম্বর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আদালতের শুনানিতে ইমরান খানের পক্ষ থেকে লিখিত মুচলেকা ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি উঠে আসে। তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই প্রতিশ্রুতি বা ক্ষমা প্রার্থনাকে ভবিষ্যতে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অনুমতি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
ভারতে তাঁর অবস্থান অব্যাহত থাকবে, নাকি তাঁকে দেশ ছাড়তে হবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আগামী ৭ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন মুম্বাই হাইকোর্ট।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।