জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রসারে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মী, গবেষক ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশের ক্ষতি হয়—এমন জ্বালানি প্রকল্প থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তাঁরা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় মোংলার নারিকেলতলা মাঠে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ স্লোগানে আয়োজিত জনসমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ ও পশুর রিভার ওয়াটারকিপারের যৌথ উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে সরকারের আগ্রহের প্রতিফলন। আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভবন, স্কুল-কলেজসহ সব সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এর ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসচিব ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়কারী শরীফ জামিল। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে সারা দেশে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে সবাইকে সম্পৃক্ত হতে হবে। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় রামপালে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ায় তাঁরা আনন্দিত এবং এ জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
তবে সুন্দরবন সংরক্ষণে সরকারের সামগ্রিক ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শরীফ জামিল বলেন, সরকার শিগগিরই রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্প বাতিল করবে বলে তাঁরা আশা করেন। একই সঙ্গে সুন্দরবন সংরক্ষণে বিজ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশের সঞ্চালক সুন্দরবন রক্ষায় আমরা সংগঠনের সমন্বয়কারী ও পশুর রিভার ওয়াটারকিপার মো. নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের ক্ষতির আশঙ্কায় দেশবাসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে সেই বিরোধিতা উপেক্ষা করেই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসহ প্রাণ-প্রকৃতির ক্ষতি হয়, এমন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করবে না বলে তাঁরা আশা করেন। বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর সবুজ, ন্যায্য, জনকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী, রিভার বাংলা সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ, মোংলা পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মো. জুলফিকার আলী, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদার, সাধারণ সম্পাদক আবু হোসেন পনি, শ্রমিক নেতা মাহবুবুর রহমান মানিক, কৃষক নেতা বদরুল আলম, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের নিখিল চন্দ্র ভদ্র, সচেতন ফাউন্ডেশনের মো. হাবিবুর রহমান এবং মিশন গ্রিন বাংলাদেশের আহসান রনি।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন হাওর অঞ্চলবাসীর জাকিয়া শিশির, কসমস সংস্থার মেহনাজ মালা, ব্রাইটার্সের সাইদুর রহমান সিয়াম, বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশনের মাসফিকুল হাসান টনি, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ারের জুবায়ের ইসলাম ও ওয়েব ফাউন্ডেশনের আসাদুজ্জামান তুহিন।
জনসমাবেশ শেষে বাঘের মহড়া, পুতুলখেলা, বাউল গান ও গাজীর গানের আয়োজন করা হয়। সাংস্কৃতিক এসব পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পরিবেশ সুরক্ষা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।