বর্তমান সময়ে ‘মুড সুইং’ শব্দটি মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তায় বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। কখনো ভালো লাগা, আবার পরক্ষণেই মন খারাপ কিংবা হঠাৎ রেগে যাওয়াকে অনেকেই মুড সুইং হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এর পেছনে শুধু হরমোন বা মানসিক কারণ নয়, জীবনযাপন, সামাজিক পরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
সম্প্রতি এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে মুড সুইংয়ের কারণ ও তা মোকাবিলার বিভিন্ন উপায় নিয়ে কথা বলেন তিনি।
মুড সুইং সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যের ভাষায় এটিকে ‘মুড সুইং’ বলা হয়। তবে বর্তমান সময়ে শব্দটির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘‘মুড সুইংও এই সময়ের একটা শব্দ আমার কাছে মনে হয়। কারণ, আমি কখনও দেখিনি যে এখন যেমন দেখি—মা রাগ করে সন্তান মেরে ফেলেছে। আমাদের এটা একটা সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।’’
আগের প্রজন্মের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তাঁর দাদি ও মায়ের মধ্যে ‘মুড সুইং’ শব্দটির ব্যবহার তিনি কখনো দেখেননি। এমনকি অনেক সন্তান থাকা মায়েদের মধ্যেও এ ধরনের বিষয় নিয়ে তেমন আলোচনা ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে মুড সুইংকে শুধু হরমোনজনিত বা মানসিক সমস্যা হিসেবে দেখার বিষয়ে তিনি সতর্ক করেন। তাঁর মতে, কোনো একটি বিষয় সম্পর্কে মানুষ বারবার শুনতে থাকলে সেটি নিজের আচরণের ব্যাখ্যা হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘‘মুড সুইং সবারই হয়, ছেলের হয়, মেয়ের হয়।’’ একই সঙ্গে নিজের আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মুডের ওঠানামা সামাল দিতে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেন ওই বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, জীবনের যেসব পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, সেগুলো নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি যানজটে আটকে থাকা বা বাইক চালানোর সময় অযথা রাগ করার বিষয়টি তুলে ধরেন। এসব পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাসকে তিনি ‘বেঁচে থাকার আর্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ ক্ষেত্রে নিয়মিত মেডিটেশন, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং শারীরিক সুস্থতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অতিরিক্ত প্রদর্শনমূলকভাবে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় খাওয়ার অভ্যাসও শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবনযাপন, সাফল্য বা ভালো থাকার প্রদর্শন থেকেও মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে ‘সোশ্যাল অ্যাংজাইটি’ ও পরশ্রীকাতরতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের ভালো কিছু দেখা অনেকের কাছে অসহ্য হয়ে উঠতে পারে। লোক দেখানো ও তুলনামূলক জীবনযাপনের প্রবণতাও মানুষের মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
মানসিকভাবে ভালো থাকতে বই পড়া, ব্রিদিং এক্সারসাইজ, গান শোনা বা গান গাওয়া এবং মন খারাপ হলে নাচের মতো আনন্দদায়ক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
মানসিক প্রশান্তির জন্য প্রার্থনার ওপরও গুরুত্ব দেন ওই বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, মানুষ যে ধর্মেরই অনুসারী হোক না কেন, সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করার চেষ্টা মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে।
তিনি বলেন, ‘‘আপনি যে ধর্মেরই হন না কেন, আপনি আপনার সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন, নিজেকে কানেক্ট করার চেষ্টা করেন—কথা বলা মানে প্রার্থনা করা।’’
মানসিক চাপ ও নিজের অনুভূতিগুলো সামলানোর ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ডায়েরি ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।
তাঁর মতে, অনেকেই নিজেদের অভিযোগ ফেসবুকে লিখে প্রকাশ করেন। এর পরিবর্তে সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের অনুভূতি ও সমস্যাগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখলে তা নিজের আবেগ বুঝতে এবং সমস্যা নিয়ে ভাবতে সহায়তা করতে পারে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কারও মাথা ব্যথা হলে ডায়েরিতে সেটি লেখার পাশাপাশি কীভাবে সমস্যাটি কমানো যায়, সেটিও লিখে রাখা যেতে পারে। এতে নিজের সমস্যাগুলোকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ তৈরি হয়।
সবশেষে তিনি বলেন, ‘‘আমরা সবকিছুকে নিজেরাই কমপ্লিকেটেড করে দিচ্ছি, সহজ বিষয়গুলোকে।’’
তাঁর মতে, মানসিক সুস্থতার জন্য নিজের আবেগ, জীবনযাপন ও দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।