ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘর্ষ ১৪তম দিনে প্রবেশ করেছে এবং পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। যুদ্ধের বিস্তৃতি ও এলোমেলোতার কারণে পুরো অঞ্চল যেন গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে। দুই পক্ষই সমাধানের পথে এগোচ্ছে না; বরং একে অপরের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ছে, ফলে ভবিষ্যৎ অজানা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। তেহরান, কাশান, ইসফাহান, কোম ও আরাক শহরে বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইরানে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং বহু আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সংখ্যা বেড়ে ১৬টি পৌঁছেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর বন্ধ থাকায় তেলের সরবরাহ কমে যাচ্ছে এবং দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের চেয়ে বড় বিপদ হলো পানির সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের পানি বিশেষ করে ‘কৌশলগত সম্পদ’ হিসেবে বিবেচিত। এই অঞ্চলে তেল বা গ্যাস নয়, বরং পানীয় জলই গুরুত্বপূর্ণ।
পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর কাছে প্রচুর তেল ও গ্যাস থাকলেও পানি সীমিত। ১৯৭০-এর দশক থেকে ডিসেলিনেশন প্লান্টের মাধ্যমে সমুদ্রের লবণাক্ত জলকে পানীয় জলে রূপান্তর করা হচ্ছে। এই প্লান্টগুলো পানীয় জলের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে, যা সেচ, শিল্প ও জনজীবনের জন্য অপরিহার্য।
ডিসেলিনেশন প্ল্যান্টগুলো মূলত দুইভাবে কাজ করে:
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ডিসেলিনেশন প্ল্যান্টের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানের প্রায় ১০ কোটি মানুষ এই প্লান্টের ওপর নির্ভরশীল। কুয়েতে প্রায় ৯০%, ওমানে ৮৬% এবং সৌদি আরবে ৭০% পানীয় জল আসে এই প্লান্ট থেকে।
যুদ্ধের সময় এই প্লান্টগুলোকে লক্ষ্য করা হলে শুধু বাণিজ্য নয়, বরং মানবিক নিরাপত্তা ও জনজীবনও বিপন্ন হবে। সাম্প্রতিক হামলায় ইরান ইউএই-এর ফুজাইরাহতে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কুয়েতে ড্রোন আক্রমণের ঘটনা ঘটে, যা সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ডিসেলিনেশন প্ল্যান্টে আক্রমণ, সাইবার হামলা বা জল দূষণ ঘটলে তা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং পানীয় জল, বিদ্যুৎ এবং নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলবে।
সিএনএএসআইএস, ব্র্যান্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য গবেষকরা বলছেন, প্ল্যান্টগুলোর নিরাপত্তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি এবং জনগণের বেঁচে থাকার ক্ষমতা নির্ভরশীল। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, চরম আবহাওয়া এবং তেলের জ্বালানি ব্যবহারের কারণে ডিসেলিনেশন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী যুদ্ধের ধারা তেলের কারণে নয়; বরং পানীয় জলের নিরাপত্তা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। যারা এই অঞ্চলের পানির সরবরাহকে লক্ষ্য করবে, তারাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।