ঈদের চাঁদ দেখা মানে শুধু একটি মাসের শেষ নয়, নতুন আনন্দের শুরু। শহরের ব্যস্ত রাস্তা থেকে গ্রামের পথ, বাজার, স্টেশন কিংবা লঞ্চঘাট—সবখানেই উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে।
শিশুরা নতুন পোশাকের অপেক্ষায় থাকে, মায়েরা রান্নার প্রস্তুতি নেন, বাবারা বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও গার্মেন্টস কর্মীরা থাকেন দুশ্চিন্তায়। তাদের ঈদের সুখ নির্ভর করে সময়মতো বেতন ও বোনাস পাওয়ার ওপর। টাকা দেরি হলে উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে যায়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান শক্তি। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশ আসে এ খাত থেকে, এবং লাখো পরিবার এর ওপর নির্ভরশীল। এ শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ। তবু প্রায় প্রতি বছর ঈদের আগে বেতন ও বোনাস নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, কোথাও উত্তেজনা বা বিক্ষোভ দেখা যায়।
সম্প্রতি বিজিএমইএর নেতারা বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নরের কাছে ঈদের আগে সহজ শর্তে ঋণ চেয়ে আবেদন করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাসিক বেতন-ভাতা দিতে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা লাগে, আর ঈদের আগে এই প্রয়োজন বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকায়। রপ্তানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম হ্রাস, ক্রয়াদেশ বিলম্ব এবং ব্যয় বৃদ্ধিকে তারা তারল্য সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শিল্পে চ্যালেঞ্জ আছে—এ কথা সত্য। কিন্তু ঈদ তো প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়েই আসে। তাহলে কেন আগাম পরিকল্পনা করা হয় না? কেন শ্রমিকদের প্রাপ্য মেটাতে শেষ মুহূর্তে ঋণের প্রয়োজন হয়?
এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, নৈতিক প্রশ্নও। সমাজে বৈষম্য স্পষ্ট—কেউ বিলাসী জীবনযাপন করেন, আবার শ্রমিকেরা সময়মতো বেতনের অপেক্ষায় থাকেন। সব মালিক এক রকম নন; অনেকেই দায়িত্বশীল। তবে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে প্রশ্ন ওঠে।
ঈদের আগে বেতন না পেলে শ্রমিক পরিবারের ওপর বড় প্রভাব পড়ে। সন্তানের নতুন পোশাক কেনা পিছিয়ে যায়, বাড়ি যাওয়ার ভাড়া জোগাড় করতে কষ্ট হয়, সংসারের খরচ মেটাতে ধার করতে হয়। এতে ক্ষোভ বাড়ে, শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হয়—যার ক্ষতি সবার।
এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণোদনা বা ঋণসহায়তা দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন আর্থিক শৃঙ্খলা ও আগাম সঞ্চয়ের সংস্কৃতি। ঈদের মতো পূর্বনির্ধারিত ব্যয়ের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন কি সম্ভব নয়?
ঈদের আগে বেতন দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি শ্রমিকের অধিকার। তারা শ্রম দিয়েছেন, উৎপাদন ও রপ্তানি আয় বাড়িয়েছেন। তাই সময়মতো তাদের প্রাপ্য পরিশোধ করাই স্বাভাবিক। প্রতি বছর যদি একই অনিশ্চয়তা দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে সমস্যা কাঠামোগত।
শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার স্বচ্ছ হিসাব, দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি। সরকারি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেটি যেন স্থায়ী নির্ভরতার সংস্কৃতি না গড়ে তোলে।
গার্মেন্টস শিল্প আমাদের জাতীয় গর্ব। এই খাত টিকে আছে শ্রমিকদের পরিশ্রমে। তাই তাদের ন্যায্য পাওনা সময়মতো নিশ্চিত করা শুধু আইনি নয়, মানবিক দায়িত্বও। ঈদের আনন্দ সবার ঘরে পৌঁছানো উচিত—শ্রমিকের ঘরেও।
ঈদ যেন উদ্বেগের কারণ না হয়। যারা সারা বছর দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরান, তাদের মুখে হাসি ফুটানোই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।