সমাজ ও পরিবারের নানাবিধ বাধা অতিক্রম করে নিজের জীবনে সফলতা অর্জনকারী পাঁচ নারীকে “অদম্য নারী পুরস্কার–২০২৫”-এর জন্য মনোনীত করেছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলা প্রশাসন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নারীরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্য অর্জন ও সংগ্রামের স্বাক্ষর রেখে সমাজে অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে উঠেছেন। পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত এই নারীদের জীবনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির অনন্য দৃষ্টান্ত।
তালা উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নের পারকুমিরা গ্রামের রাবিয়া বিবি অর্ধাহার-অনাহারে সন্তানদের মানুষ করেছেন। একসময় কর্মহীন ও চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও হাল ছাড়েননি তিনি। নানা কাজ করে দুই সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করেছেন। তার বড় মেয়ে ব্র্যাকে চাকরি করছেন এবং ছেলে নিজে পানির মেশিন বসানোর ব্যবসায় যুক্ত। দুঃখ-দুর্দশা পেছনে ফেলে এখন তারা স্বচ্ছল ও সুখী পরিবার।
কোমল চন্দ্র পালের মেয়ে রুপা পাল বড় হয়েছেন দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতায়। জামা-জুতা ছাড়া স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কাটালেও থেমে যাননি তিনি। বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন প্রজেক্ট ও গবেষণায় তার সাফল্য তাকে ২০১৯ সালে থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ এনে দেয়। বর্তমানে তিনি পাটকেলঘাটা আদর্শ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে তিনি সবসময় অগ্রগামী।
অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া সুচিত্রা দাশ অল্প বয়সে বিয়ে হলেও দারিদ্র্য ও কষ্টকে বাধা হতে দেননি। মজুরি করে সংসার চালিয়েও দুই সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তার ছেলে ৪৮তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার এবং মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছে। সন্তানদের সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই তাকে দিয়েছে “সফল জননী”র মর্যাদা।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে, পরপর মৃত সন্তান, শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন, স্বামীর জেলযাত্রা—সব মিলিয়ে জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ফরিদা বেগম। একমাত্র কন্যাকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটানোর মধ্যেও তিনি নিজেকে দাঁড় করান দর্জির কাজে। আত্মনির্ভরতার সেই যাত্রায় মেয়েকেও উচ্চশিক্ষিত করেন এবং চাকরি নিশ্চিত করেন। বর্তমানে দর্জির কাজ করে তিনি স্বাবলম্বী ও স্থিতিশীল জীবনযাপন করছেন।
খলিলনগর ইউনিয়নের শিরিনা সুলতানা দরিদ্র কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়েও ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। ২৪ বছর বয়সে প্রথমবার ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়ে ধারাবাহিকভাবে তিনবার দায়িত্ব পালন করে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। রাস্তা, কালভার্ট, স্যানিটেশন, ভাতা প্রদান, নারীর দক্ষতা বৃদ্ধি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ—সবক্ষেত্রে তার অবদান প্রশংসনীয়। সমাজ উন্নয়ন ও মানবকল্যাণই তার জীবনের প্রধান অঙ্গীকার।
তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, “এরা প্রত্যেকেই নিজেদের জীবনে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে এসে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন। তাদের সম্মাননা অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।”
২০২৫ সালের “অদম্য নারী পুরস্কার” প্রদান অনুষ্ঠানে এই পাঁচ সংগ্রামী নারীকেই বিশেষভাবে সম্মানিত করা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।