দেশের অর্থনীতির প্রধান ভরসা—রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় ঘনিয়ে আসা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের তীব্র অস্থিরতা, বন্দরের মাশুল বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নিয়মকানুনসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় এই শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে। গত চার দশকেও পোশাক শিল্পের সমানতালে কোনো বিকল্প রপ্তানি খাত গড়ে না ওঠায় সামগ্রিক অর্থনীতিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চার দশক ধরে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে তৈরি পোশাক খাত। কিন্তু মহামারি করোনা এই ধারাকে বড় ধাক্কা দেয়। আমদানি-রপ্তানি ক্রিয়াকলাপ স্থবির হয়ে পড়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি কমে যায়। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক বাজারে নতুন সংকট সৃষ্টি করে। ইউরোপে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় শিল্পকারখানা ব্যাহত হয়, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় আর পোশাকের ক্রয়াদেশও কমে আসে।
এ পরিস্থিতি কাটতে না কাটতেই দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয়। সরকার বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করলেও শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গ্যাসের দাম প্রায় দেড়গুণ বৃদ্ধি পায়। চলতি বছরের এপ্রিলে শিল্পখাতে গ্যাসের দাম আবার বাড়ানো হয় এবং ডিজেল ও ক্যাপটিভের দামও বৃদ্ধি পায়। তবুও উৎপাদনমুখী কারখানাগুলো সময়মতো গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন বন্ধ থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বিদ্যুতের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫ শতাংশে দাঁড়ানো, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং ঋণ শ্রেণিকরণ নীতির পরিবর্তনের ফলে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন না। পাশাপাশি ২০২৩ সালে শ্রমিকদের মজুরি ৫৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৯ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে। অবকাঠামোগত দুরবস্থা, বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অচলাবস্থা, ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
প্রণোদনা না দিয়ে বরং তা ৬০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ায় উদ্যোক্তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিনা কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ৪১ শতাংশ ফি বৃদ্ধিতে ছোট-মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি বিদেশি ব্যবসায়ীরাও এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বন্দর কর্তৃপক্ষ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ব্যবসা পরিচালনার খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের পর অধিকাংশ দেশে রপ্তানিতে আর শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে না। এখনো পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করতে না পারায় বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে বাংলাদেশ। অন্যদিকে প্রতিযোগী দেশগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন এফটিএ চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, দেশের অর্থনীতির ৬০–৮০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ও শ্রমিক বেতন-ভাতা দুটোই হুমকির মুখে পড়বে। এলডিসি গ্রাজুয়েশনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও যথাযথভাবে হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস–বিদ্যুতের স্থায়ী সমাধান, ক্রেতা দেশের সঙ্গে এফটিএ, উন্নত মহাসড়ক ও কার্যকর মাদার পোর্ট ছাড়া প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, বন্দরের অতিরিক্ত মাশুল বৃদ্ধি এবং প্রণোদনা কমে যাওয়ায় ব্যবসা আরও সংকটপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, তৈরি পোশাক শিল্পের মতো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও বিপদের মুখে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, খেলাপি ঋণ ২৭ শতাংশেরও বেশি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে গেছে। মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্যের অভাব, আমদানিনির্ভরতা এবং উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
বিজিএমইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য কোনো প্রস্তুতি না থাকায় ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, সুদহার কমানো, এনবিআরের ব্যবসাবান্ধব নীতি ও এসএমই খাতের জন্য সহায়তা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ৪১ শতাংশ বন্দর ফি বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নেই। বন্দর একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক সংস্থা নয়। অথচ কয়েক বছরের মুনাফা থাকা সত্ত্বেও এত বড় অঙ্কে ফি বাড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি জানান, শ্রমিক সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়ন বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। মাত্র ২০ জন শ্রমিক নিয়ে ইউনিয়ন গঠন করা সম্ভব হওয়ায় নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের শ্রমিক অস্থিরতার কারণও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ভবিষ্যতে শ্রমিক সংগঠনগুলো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।