নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় সমিতির নামে পরিচালিত এক দাদন ব্যবসার ফাঁদে পড়ে বহু মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। চড়া সুদে টাকা নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় কেউ কারাগারে, কেউ আবার গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, ফলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্র, উপজেলা প্রশাসন এবং কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দুয়া উপজেলার সান্দিকোনা বাজারে “সমিতি”র নামে গড়ে ওঠা এক দাদন ব্যবসা পরিচালনা করছেন ওই এলাকার রফিকুল আলম। কৃষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক নিয়ে তিনি বহু বছর ধরে সুদের ব্যবসা চালাচ্ছেন। সময়মতো টাকা ফেরত দিতে না পারায় অনেকেই তার কাছে সব হারাচ্ছেন— এমনকি আত্মীয়স্বজনও বাদ যাচ্ছেন না।
চার বছর আগে পারিবারিক প্রয়োজনে মামুদপুর গ্রামের শিরিন আক্তার তার ভগ্নিপতি রফিকুল আলমের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা ধার নেন। এ সময় রফিকুল তার কাছ থেকে স্বাক্ষরিত দুটি খালি চেক নেন। কিছুদিন পর শিরিন ৬০ হাজার টাকা ফেরত দেন।
শিরিনের স্বামী মিল্টন মিয়ার অভিযোগ, বাকি ৯০ হাজার টাকা ও সুদ দিতে না পারায় রফিকুল একটি চেকে ২১ লাখ টাকা বসিয়ে চেক ডিজঅনার মামলা করেন। পাশাপাশি তার বোন আইরিন আক্তারের নামেও ২০ লাখ টাকার আরেকটি মামলা করানো হয়। ওই মামলায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত শিরিনকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠান।
এতে চরম বিপাকে পড়েছে পরিবারটি। জেলে থাকা শিরিনের প্রতিবন্ধী দুই ছেলেকে একটি ঘরের বারান্দায় তালাবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে, আর বাকি দুই শিশুর দেখাশোনায় হিমশিম খাচ্ছেন স্বামী মিল্টন।
মিল্টন অভিযোগ করে বলেন, “রফিকুল আলম মিথ্যা মামলা সাজিয়ে আমার স্ত্রীকে জেলে পাঠিয়েছে। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে এ কাজ করেছে সে। এখন প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি।”
শিরিনের মা তাহেরা আক্তার (৭৮) বলেন, “আমার মেয়েকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। সে এত টাকা নেয়নি। আমার অন্য দুই মেয়ে সম্পত্তির লোভে রফিকুলের সঙ্গে যোগ দিয়ে এ মামলা করেছে।”
শুধু শিরিন নন, একই গ্রামের শিবলী আক্তার নামের এক নারীও সুদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে চার বছর ধরে গ্রাম ছাড়া। মামলায় গ্রেফতারের ভয়েই সম্প্রতি তার মায়ের মৃত্যুর পরও তিনি বাড়ি ফেরেননি।
শিবলীর ভাই রনি মিয়া জানান, রফিকুলের ‘রূপা সমিতি’ থেকে তার বোন ২ লাখ টাকা ধার নিয়ে ব্ল্যাংক চেক দেন। পরিশোধে দেরি হওয়ায় ৮ ও ১৬ লাখ টাকার দুটি মামলা করা হয়, এরপরই তাকে পালাতে হয়।
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য কামরুজ্জামান বলেন, “রফিকুল আলম সমিতির আড়ালে চড়া সুদে দাদন ব্যবসা চালাচ্ছে। অনেকেই এ ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন। এমনকি হেনু মিয়া নামের এক ব্যক্তি ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করেও রেহাই পাননি। এসব অন্যায়ের কঠোর বিচার হওয়া দরকার।”
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, “আমাকে এসব বিষয়ে বিরক্ত করবেন না,” এরপরই ফোন সংযোগ কেটে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ইউনুস রহমান জানান, ‘রুরাল ইউনিক প্রগ্রেসিভ অ্যাসোসিয়েশন (রূপা)’ নামে কোনো সমিতি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত নয়। এ ধরনের দাদন ব্যবসার অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমদাদুল হক তালুকদার বলেন, “দাদন ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ। কেউ প্রতারণার শিকার হলে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।