বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ইতিহাসে স্থান পেয়েছে, তাতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান অন্যতম প্রধান চরিত্র। খুব অল্প সময়েই তিনি এমনভাবে আলোচিত হন, যেভাবে আর কোনো সামরিক কর্মকর্তা বা রাজনীতিক হতে পারেননি। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তার কিছু সিদ্ধান্ত দেশি-বিদেশি মহলে প্রশংসা কুড়ায়, এবং তার অনেক পদক্ষেপের ইতিবাচক প্রভাব আজও বাংলাদেশ অনুভব করছে।
তবে জিয়াউর রহমানের উত্থান শুরু রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, একজন সৈনিক হিসেবে। ১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর রেডিও ও টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি নিজেই বলেছিলেন,
“আমি রাজনীতিবিদ নই, আমি একজন সৈনিক। আমাদের সরকার সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক।”
কিন্তু সেই সৈনিক কীভাবে রাষ্ট্রের কর্ণধারে পরিণত হলেন? সেই উত্তর খুঁজতে গেলে যেতে হয় ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে—যে “সৈনিক-জনতার বিপ্লব” তাকে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে দেয়।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্বে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করে আলোচনায় আসেন জিয়া। তার নেতৃত্বে ওই রেজিমেন্টের সাহসিকতার কারণে লাহোর রক্ষা পায়। এই কৃতিত্বের জন্য তিনি পাকিস্তান সরকারের হিলাল-ই-জুরাত পদকে ভূষিত হন।
এর ছয় বছর পর, ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রামে অবস্থানরত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়নের কমান্ডার ছিলেন তিনি। ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার পর তিনি বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ মার্চ ভোরে জিয়া লেফটেন্যান্ট জেনারেল জানজুয়াকে বন্দি করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭ মার্চ কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দেন ও জেড ফোর্স গঠন করেন। এসব কর্মকাণ্ড তার জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করে।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনী পুনর্গঠিত হলে ১৯৭২ সালে মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ সেনাপ্রধান হন, আর জিয়া হন তার সহকারী। ক্রমানুসারে সেনাপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আপত্তি তোলেননি, তবে সেনাবাহিনীর ভেতরে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতি হন খন্দকার মুশতাক আহমদ, যিনি ২৪ আগস্ট জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। যদিও এই ঘটনার সঙ্গে জিয়ার সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি।
এরপর ঘটে নতুন অভ্যুত্থান। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ ও শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে সেনা বিদ্রোহে জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয়, যা সৈন্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এম এ হামিদ তার বই “তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা”-তে লেখেন—
“চিফ অব স্টাফ বন্দি—এটা সৈন্যরা মানতে পারেনি। সেই ভুল সিদ্ধান্তই জিয়ার জনপ্রিয়তাকে আকাশচুম্বী করে তোলে।”
৩ নভেম্বরের ঘটনার পর জনমনে ধারণা জন্ম নেয়, এটি ভারতের প্রভাব ও আওয়ামী লীগের পরিকল্পনায় হয়েছে। এতে খালেদ মোশাররফ সমর্থন হারান। ৬ নভেম্বর রাতে ক্যান্টনমেন্টে লিফলেট ছড়ানো হয়—“সৈনিক-সৈনিক ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই।” তবে সৈনিকরা জিয়াকে আলাদা চোখে দেখেছিল। তার বাসার সামনে তারা স্লোগান দেয়—
“সৈনিক ভাই ভাই, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ।”
৭ নভেম্বর ভোরে বিদ্রোহী সৈন্যরা জিয়াকে মুক্ত করে। এই আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহের এবং বামপন্থী দল জাসদ। তারা ভেবেছিল, জনপ্রিয় এই সেনা কর্মকর্তাকে নিজেদের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। কিন্তু মুক্তির পর জিয়া দ্রুত পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেন এবং সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তার দৃঢ় নেতৃত্বের কারণেই সে সময়ের রাষ্ট্রীয় সংকট প্রশমিত হয়।
বিদ্রোহ চলাকালে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দার নিহত হন। যদিও জিয়া তাদের নিরাপত্তা দিতে চেয়েছিলেন, সৈন্যদের রোষে তা সম্ভব হয়নি।
৭ নভেম্বরের মাত্র দুই সপ্তাহ পর জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন এবং ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার রাজনৈতিক উত্থানকে অনেকেই “জনতার চাহিদা ও সেনাবাহিনীর আস্থা”র ফল হিসেবে দেখেন।
রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে জিয়া সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন শুরু করেন। তিনি বাতিল করেন একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা এবং পুনরায় বহুদলীয় রাজনীতি চালু করেন।
জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তিনি ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে অঞ্চল ও রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয় পরিচয়ের ধারণা দেন, যাতে বাংলাদেশের সব জনগোষ্ঠী “বাংলাদেশি” পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। তার বিশ্বাস ছিল—
“যে রাজনীতির অনুপ্রেরণা বাংলাদেশের মাটি থেকে জন্মাবে না, সে রাজনীতি বাংলাদেশের মাটিতে টিকে থাকবে না।”
(আমার রাজনীতির রূপরেখা, জিয়াউর রহমান)
জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করতে জনশক্তি রপ্তানি, পোশাক শিল্প স্থাপন ও বিদেশে রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করেন। এই উদ্যোগগুলো আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
লেখক হুমায়ূন আহমেদ তার উপন্যাস “দেয়াল”-এ লিখেছেন,
“জিয়াউর রহমানের পাঁচ বছরের শাসনামলে কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল, মানুষ বিশ্বাস করেছিল—দেশের নেতৃত্বে একজন সৎ মানুষ আছেন, যিনি নিজের জন্য নয়, দেশের জন্য চিন্তা করেন।” (দেয়াল, পৃষ্ঠা- ১৯৩)
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন জিয়াউর রহমান। তার জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কতটা জায়গা করে নিয়েছিলেন। তার হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও অনাবিষ্কৃত।
জিয়ার সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রভাবশালী রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে—একজন সৈনিকের থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার ইতিহাস, যার ভিত্তি ছিল ৭ নভেম্বরের সেই ঘটনাপ্রবাহ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।