সাতক্ষীরার এক অজপাড়া গ্রামের ঘটনা জীবনের পাতা থেকে নেওয়া, যদি কোন গরীব দেশের গরীব মানুষের নাম খোঁজা হয়, তাহলে সর্বপ্রথম আসবে মোবারেকের নাম। মোবারেক খুব দরিদ্র পরিবারের সন্তান, তার মা আমাদের বাড়িতে কাজ করতো, আর বাবা ঘাস কেটে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতো। মোবারেকরা তিন ভাই ও চার বোন। সেই চল্লিশ বছর আগে থেকে, যখন আমি আমার শিশু বয়েসে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকে দেখেছি তাদের সংসারে খুব অভাব। কোন দিন তারা পেট ভরে তিন বেলাতো দূরের কথা এক বেলাও ঠিকমত ভাত খেতে পারেনি।
তার মা আমাদের বাড়িতে কাজ করায় মোবারেক, তার ভাই মোসলেক ও মানিক বেশির সময় আমাদের বাড়িতে তার মায়ের সাথে থাকতো। তার মা যখন আমাদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করতো, তখন তারা মা তিন সন্তানকে নিয়ে ভাগ করে খাওয়ার চেষ্টা করতো। মোবারেক ও তার ভাইয়েরা ন্যাংটা বয়স থেকে সবসময় আমাদের বাড়িতে থাকতো, যারফলে আমরা সব ভাই-বোনরা তাদের সাথে খেলতাম, এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতাম। সেই সময় থেকে মোবারেক আমার প্রিয় বন্ধু।
মোবারেকের পরিবার দরিদ্র হওয়ার কারণে সে একদিনের জন্য স্কুলে যেতে পারেনি, তার একটি ভাই ছাড়া আর কোন ভাইবোন স্কুলে যেতে পারেনি। মোবারেকের ভাই মোসলেমও আমার সমবয়সী। তাই মোসলেমও আমার বন্ধু মানুষ ছিল, তবে বন্ধুত্ব মোবারেকের সাথে বেশি ছিল। তারা দুই ভাই একটু বড় হওয়ার সাথে সাথে পরিবারের খরচ চালানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় কামল দেওয়া শুরু করে, যেটা আমাদের গ্রামের ভাষায় জোন দেওয়া বলে।
আমার ছোট ভাই আমার চেয়ে হাজার গুণ বেশি গেছে মোবারেকদের বাড়িতে, কারণ আমার ছোট ভাই বড় বা মানুষ হয়েছে মোবারেকের মায়ের কোলে, তাই মোবারেকের মা প্রায়ই আমার ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে মোবারেকদের বাড়িতে নিয়ে যেত, তাদের বাড়িতে মোবারেকের ছোট ভাইয়ের সাথে খেলতো, মোবারেকের ছোট ভাই আমার ছোট ভাইয়ের বয়সী।
মোবারেকের বোনেরা বড় হলে মোবারেকের মা আর আমাদের বাড়িতে কাজ করতো না, কাজ করা শুরু করলো মোবারেকের বোনেরা। প্রথমে মোবারেকের বোন পুটু কাজ করে, তারপর আমার আম্মার সহযোগিতায় পুটুর বিয়ে হয়ে গেলে তার বোন ছইরোন কাজ শুরু করে। তাই বলা যায় ওদের পরিবারের সবাই আমার আম্মার কাজের প্রয়োজনে আমাদের পরিবারে কাজ করতো, যখন কাজের জন্য বেশি লোকের প্রয়োজন হতো তখন মোবারেকের মাও মাঝে মাঝে কাজ করতো। তাই বলা যায়, মোবারেকেদের পরিবারের সাথে আমাদের পরিবারের সবার-ই ঘনিষ্ঠতা অনেক বেশি।
একবার আমি যখন ক্লাস টুতে পড়ি তখন বিকাল বেলা আমাদের বাড়ির পাশের একটি মাঠে খেলা করছিলাম, হটাৎ দেখি দূরের একটি জায়গায় অনেক উচুতে আগুন আর ধোয়া, দূর থেকে শোনা যাচ্ছে কোন একটি বাড়িতে আগুন লাগায় সবাই হৈচৈ করছে, পানি নিয়ে নিভানোর কাজে অনেকে ব্যস্ত। পরে কোন বাড়িতে আগুন লাগলো সেটা দেখার জন্য খেলা বাদ দিয়ে আমরা সবাই গেলাম, গিয়ে দেখি মোবারেকদের বাড়িতে আগুন লেগেছে, আর মোবারেকের মা সহ অন্যান্যরা উঠানে বসে কান্নায় আহজারি করছে, তাদের আহজারি দেখে ছোট বয়সেই অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম, যেটা এখনো ভুলতে পারিনি।
অনেক বছর পরে হটাৎ একদিন আম্মা ফোন করে বল্লো মোসলেম খুব অসুস্থ, পরে জানতে পারি তার হার্টে ব্লক হয়েছে, আমি গ্রামে গিয়ে মোসলেমকে বললাম ভারী কাজ করবি না, একটা চায়ের দোকান দিয়ে সংসার চালা, প্রয়োজনে আমি দোকান করার জন্য কিছু টাকা দিব, আর বললাম ওষুধ ঠিকমত খাস, কিন্তু এটাও জানি এত দরিদ্রদের মধ্যে ঔষুধ এর টাকা কোথায় পাবে!
মোসলেম হার্টের অসুখ নিয়ে চার/পাচ বছর বেঁচে ছিল, একদিন হটাৎ আম্মা ফোন করে জানালো মোসলেম মারা গেছে, এটা শুনে একটা কঠিন চাপা কষ্ট অনুভব করলাম। এর কিছুদিন পর মোবারেক স্টোক করলো, এটা জেনে আমার আম্মা মোবারেকের বড়িতে গিয়ে দেখে মোবারেক অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে, আর তার স্ত্রী ও বাচ্ছারা কান্নাকাটি করছে। আম্মা বাড়িতে এসে টাকা দিয়ে আমার ছোট ভাইকে বল্লো, এক্ষুনি মোবারেককে হসপিটাল নিয়ে যাও, মোবারেক মারা গেলে তার ছোট ছেলেমেয়েদের কে দেখবে।
আমার ছোট ভাই অজপাড়া গ্রামের মোবারেককে সাতক্ষীরার সদর হসপিটালে নিয়ে চিকিৎসা করায়, ফলে মোবারেক আবার সুস্থ হয়ে উঠে। আমি বাড়িতে গিয়ে মোবারককে বল্লাম, তুই আর ভ্যান চালাবি না, ভারি কাজ করবি না, একটা চায়ের দোকান দে, প্রয়োজন আমি কিছু টাকা দিব, যদি তুই ভ্যান চালাস তাহলে আর বাচবি না। এর কয়েক বছর পর আমার আম্মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আম্মা মৃত্যু বরণ করলে মোবারেক আর ছোট ছেলেরা
আমাদের বাড়িতে এসে খুব কান্নাকাটি করলো, আর বল্লো ফুফু হসপিটালে নিয়ে চিকিৎসা করে আমাকে বাচালো, কিন্তু ফুফু আজ নেই, এখন থেকে কে আমাদের দেখবে!
আমি শুধু আম্মার মৃত্যুর শোকে আমার কোন কিছু বলার ভাষা ছিল না।কিছুদিন আগে গ্রাম থেকে হটাৎ একটা ফোন আসলো মোবারগক আবার অসুস্থ হয়েছে, তাকে তার চাচাত ভাই হসপিটালে নিয়ে গেছে, আমি পরে আবার খোজ নিয়ে জানতে পারলাম মোবারেক হসপিটালে আগের চেয়ে সুস্থ আছে, আরও জানলাম মোবারক যখন অসুস্থ হলো তখন বাজারে গিয়ে একজন মুদি দোকানদার আয়ুবকে বল্লো, আমাকে ২০ টা টাকা হাওলাত দাও, গতকাল আমি পেসারের ওষুধ খেতে পারিনি, তাই আমার শরীর খুব খারাপ লাগছে, আমাকে পেশারের ওষুধ কিনে খেতে হবে, দোকানদার তাকে ২০ টাকা দিল ওষুধ কেনার জন্য, ওষুধ খাওয়ার পর সুস্থ না হওয়ায় তাকে হসপিটালে নিলো। কিন্তু আর সুস্থ হতে পারেনি, তারপর দিন সকালে সে হসপিটালে মৃত্যু বরণ করলো।
আমার কাছে তার মৃত্যুর খবর আসার পর খুব কষ্ট পেলাম, আর ভাবলাম আম্মা বেচে না থাকায় মোবারেকের হ্রদয় দিয়ে অনুভব করে কেউ চিকিৎসা করেনি, তাই তার মৃত্যু হলো। মোবারকের সাথে কত খেলা ও বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বাড়ানোর স্মৃতি রয়েছে, যা মনে পড়লে আমি নিরব হয়ে যায়, অন্য জগতে চলে যায়। মোসলেমের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য মোসলেম যে রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকান দিয়েছি সেই মোড়ের নাম মোসলেমের মোড় নাম দিয়ে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছিলাম, মোবারেকের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তার বাড়ির পাশের একটি রাস্তার মোড়ের নাম মোবারেকের মোড় নাম দিয়ে একটি সাইনবোর্ড টনিয়ে দিয়েছি।
মোবারেকের বড় ছেলেটাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করায় মোবারেকের উপর আমি খুব রাগ করেছিলাম, বলেছিলাম ছেলেকে হাইস্কুলে পড়িয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে, হাদিস-কোরআন-নামাজ মসজিদের হুজুরের কাছে শিখতে। পরে একদিন শুনি, মোবারক তার ছেলেকে হাইস্কুলে ভর্তি করেছে, এসএসসি ও এইসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে ভর্তি হয়েছে। আমি মোবারককে ডেকে বললাম তোদের পরিবারে আর অভাব, দুঃখ্য-কষ্ট থাকবে না। আমি ছোট বেলায় যার কোলে বড় হয়েছি, সে হলো মতির নানি আর মতির মা।
তাদেরকেও আমি দেখেছি দারিদ্রের মাঝে কিভাবে জীবনযাপন করেছে কিভাবে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু বরণ করেছে। তারা সবাই আমার স্মৃতিতে মহা মূল্যবান হয়ে রয়েগেছে, তাইতো গ্রামকে একদিনের জন্যও ভুলে থাকেনি।
দেখতে দেখতে গত চল্লিশ বছরে দেশের অনেক পরিবর্তন বা উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু মোবারকদের তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি। এই দেশে লক্ষ লক্ষ মোবারকের পরিবারের মত পরিবার আছে, এই পৃথিবীতে শত শত কোটি মোবারকের মত পরিবার আছে, তাদের কোন উন্নয়ন নেই, আছে ধনীদের উন্নয়ন।
এত এত বিশ্ববিদ্যালয়, এত এত গবেষণা, এত এত বিজ্ঞানী, এত এত অর্থনীতিবিদ, এত এত রাজনীতিবিদ, এত এত ধনীরা, এত এত ধনী দেশ তারপরও মোবারকদের কোন উন্নয়ন হয় না, তাহলে সবাই কি একসাথে ব্যর্থ!
প্রযুক্তির উন্নয়নে পৃথিবী আজ উন্নতির শিখরে পৌছিয়েছে, সর্বশেষ প্রযুক্তি এআই যা দিয়ে অনেক জটিল ও কঠিন কাজ করা সম্ভব হচ্ছে, ভবিষ্যতে আরো জটিল জটিল কাজ করা সম্ভব হবে, কিন্তু দারিদ্র্য বিমোচনের কোন প্রযুক্তি আসছে না, যা দিয়ে দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন করে তাদের মুখে হাসি ফুটানো যায়। কোনভাবেই মোবারকের পরিবারের মত পরিবারকে উন্নয়নের কাতারে আনা হচ্ছে না, এ ব্যর্থতা পৃথিবীর সমগ্র মানুষের ব্যর্থতা।
পৃথিবীর সবাই জানলো মোবারক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, তার ভাই মোসলেম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, কিন্তু কেউ জানলো না দারিদ্র্যের কারণে ওষুধ কিনতে না পেরে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। চরম সত্য না জেনে সারা পৃথিবী জানলো চরম মিথ্যা। সত্য জানার জন্য, বুঝার জন্য যে হ্রদয়বান মানুষ প্রয়োজন তা আজ বিশ্বে বড় অভাব। জয় হোক সারা পৃথিবীর মোবারকদের, জয় হোক দারিদ্র্য মানুষের, জয় হোক মানবতার।
লেখক ও গবেষক: মো: জিয়াউর রহমান
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ সুমন
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: মাঝিরকান্দা (মৃধাকান্দা কাঠালীঘাটা রোড), নবাবগঞ্জ, ঢাকা-১৩২০।